দরজা খুললেই পাশের বাড়ি, একটা জানালা, চেনা মানুষের মুখ আর প্রতিদিনের কত গল্পকথার ঝুড়ি। ভাড়াটে বাড়িতে পাশাপাশি দরজায় জীবনের কত হাসিকান্নার গল্প ভাগ করে নেয়া। এক সময়ে হারিয়ে যায় প্রতিবেশী। কিন্তু স্মৃতি রয়ে যায়। মনের মধ্যে থাকে কতগুলো সুন্দর সময়ের গল্প উজ্জ্বল হয়ে। সেই প্রিয় প্রতিবেশীকে মনে করেই এবার প্রণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘ প্রিয় সেই প্রতিবেশীরা’।
আজও ভুলিনি ছোট্টবেলার খেলার সাথী রুমা-সিমাকে
আশীকুজ্জামান টুলু (গানের মানুষ)
রুমা সিমার আম্মার নাম কি ছিলো তা জানিনা কারন সেই ষাটের দশকের শেষ ভাগে যখন একেবারে মাটির সঙ্গে কথা বলি, তখন পাশের বাসার খেলার সাথী রুমা সিমার আম্মার নাম জানারও কথা না । রুমা এবং সিমার মাঝামাঝি বয়সের ছিলাম আমি যার কারনে রুমা কিংবা সিমা ঠিক জুতসই ভাবে আমাকে খেলতে নিতোনা, কেমন একটা প্রচ্ছন্ন ডিস্ক্রিমিনেশন ছিলো । তা যাই হোক আমি গায়ে পড়েই খেলতাম ওদের সঙ্গে, তার মধ্যে ওরা মেয়ে হওয়ার কারনে ঐ শিশু বয়স থেকেই ওদের প্রতি একটা টান অনুভব করতাম । আসলে ছেলেদের মধ্যে এই টানটা ঐ শিশু বয়স থেকেই আসে, তবে আমার মনে হয় মেয়েদের মধ্যে এই বিষয়টা আরও অনেক পরে আসে । রুমা সিমার আম্মাকে আমি খালাম্মা বলেও ডাকতাম না কারন এতই ছোট ছিলাম যে আম্মার বয়সী কাউকে যে খালাম্মা বলতে হয়, তা তখনও শিখিনি । উনি আম্মার বান্ধবী ছিলেন । সব সময় আম্মার সঙ্গে গল্পও করতেন, আম্মা উনার বাসায় যেতেন, উনি আসতেন আমাদের বাসায় । আম্মা উনার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতেন, সঙ্গে আমি আর রুমা সিমাও যেতাম । মাঝে মাঝে শুধু আম্মা ও রুমা সিমার আম্মা আমাদের রেখে সিনেমা দেখতে যেতেন । রুমা সিমারা ওদের বড় বারান্দায় কুত কুত খেলতো চাড়া দিয়ে আর আমি বেকুবের মতো ওদের দিকে তাকায় থাকতাম কারন ঐসব মেয়েলি খেলা মোটেও ভালো লাগতো না । স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলো । আমাদের ১৩৬/২ হাজি ওসমান গনি রোডের বাসার গলিতে প্রায় ৫/৬টা পরিবার থাকতো । ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে পশ্চিমা বাহিনীর ঢাকায় সংগঠিত জ্বালাও পোড়াও এর কয়েক মাস পরে আমরা পালিয়ে আমাদের গ্রামে চলে গেলাম । আমাদের সঙ্গে সঙ্গে গলির সবাই যে যার গ্রামে পালিয়ে গেলো প্রান বাঁচাতে । রুমা সিমারাও গলির সবার মতো বাসায় তালা মেরে দেশে পালিয়ে গেলো । স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ হলো, দেশ স্বাধীন হলো । আমরা ফিরে গেলাম ঢাকায় । আমাদের পরে একে একে সবগুলি পরিবার ফিরে এলো যে যার বাসায় । রুমা সিমাদের দরজাটা তালা মারাই থেকে গেলো কয়েক মাসের জন্য । আমরা ভাবলাম ওরা হয়তো একটু দেরী করছে, হয়তো যেকোনো একদিন চলে আসবে । প্রায় মাস পাঁচেক পার হয়ে গেলো, রুমা সিমারা ফিরলো না । আমাদের বাড়ীওয়ালা হাজি সাহেব দরজার তালা ভেঙ্গে ফেললেন কারন গত৫/৬ মাস উনি কোন ভাড়া পাচ্ছিলেন না তাই স্থানীয় লোকজনকে জানিয়ে তালা ভেঙ্গে ফেললেন । ওদের মালপত্র ধীরে ধীরে সরিয়ে কোন একটা জায়গায় রেখে দিলেন যাতে যদি ওরা ফিরে আসে, তাহলে ফেরত দিয়ে দিবেন এবং বাসাটা আরেকজনকে ভাড়া দিয়ে দিলেন । এরপর আরও ছয় মাস কেটে গেলো, ১৯৭২ সাল চলে এলো । ওই বাসা ছেড়ে আমাদের বনগ্রামে চলে যাওয়ার সময় চলে এলো তবুও রুমা সিমারা আর ফিরলো না । আমরাও ওদের আর কোন খবর পেলাম না, কোথায় গেলো, কি হলো ওদের, কিছুই জানতে পারলাম না । আমরা ১৯৭২ সালে বনগ্রামে চলে গেলাম । তারপর আম্মার সঙ্গে একবার ১৯৭৩ সালে আমাদের পুরনো বাসাটা দেখতে গিয়েছিলাম । গিয়ে দেখলাম আমাদের বাসায় অন্য ভাড়াটে এসেছে । গলির অনেকেই চলে গিয়েছে যে যার মতো । রুমা সিমাদের বাসাতেও অন্য ভাড়াটে এসেছে কিন্তু রুমা সিমারা আর আসেনি । বাড়ীওয়ালা হাজি সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো । উনিও আর কোন খবর পাননি রুমা সিমাদের । আমরা চলে এসেছিলাম ফিরে । আম্মা আর খবর নেননি রুমা সিমাদের । বাড়ীওয়ালা ওদের আসবাবপত্র কি করেছিলো সেটা জানা যায়নি । আম্মা ধীরে ধীরে ভুলে গিয়েছিলেন রুমা সিমার আম্মাকে, শুধু আমি ভুলিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে হারিয়ে যাওয়া রুমা সিমাদের । আজও মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেই ছোট্ট বেলার খেলার সাথী রুমা সিমাকে আর ওর খুব সুন্দরী আম্মাকে।
প্রতিবেশী পাড়া
অঞ্জন আচার্য (লেখক)
ময়মনসিংহে আমরা যে কানাগলির পাড়াটিতে থাকতাম, লোকমুখে তার নাম ছিল ‘লাইলি পট্টি’। এই নামটির পেছনে একটি পুরোনো ইতিহাস আছে। মোটাদাগে, ওখানে অনেক ‘লাইলি’র বাস ছিল বলে ছোট সেই মফস্বল শহরের মানুষের মুখে মুখে ঘুরতো। এর কারণ হয়তো, আমাদের পাড়ার মেয়েরা অন্য পাড়ার মেয়েদের থেকে ছিল বংশ পরম্পরায় প্রতিযোগিতামূলক সুন্দরী। আর তাই পাড়াটিতে সময়ে-অসময়ে কারণে ও অকারণে ঘুরপাক খাওয়া চেনা-অচেনা ‘মজনু’দের দেখতে দেখতে আমরা বড় হয়েছি। তবে কৈশোরে সদ্য গজানো গোঁফের মতো লজ্জাবোধের জন্ম হওয়ার পর সেই আরোপিত অথচ পরিচিত নামটি বেশ সঙ্কোচে ফেলে দিতো বৈকি! তাছাড়া ‘পাড়া’কে ‘পট্টি’ বলা যত না আঞ্চলিকতায় দুষ্ট ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল ‘অভব্যতা’—সেটা জেনেছি আরো অনেক পরে। কারণ শহরের গাঙ্গিনারপাড়ের সবচেয়ে বড় ‘খারাপ পট্টি’টি ছিল আমাদের পাড়া থেকে হাঁটাপথে দু-তিন মিনিটের।
মশকরা করেই হোক কিংবা ইঙ্গিতপূর্ণ কারণেই হোক—এই নামকরণের পেছনের আসল কারণ ছিল অনেকেরই অজানা। বহুদিন পর জেনেছি, উত্তরাধিকারসূত্রে পাড়াটি ছিল স্বর্ণকুমারী দেবী নামে এক নিঃসন্তান বারনারীর। তিনি ছিলেন বিপত্নিক ও সন্তানহারা ভূস্বামী লালাশঙ্কর রায়ের উপপত্নী। ‘লালাশঙ্কর’ নামের সূত্র ধরেই ‘লাইলি’ শব্দের বুৎপত্তি বলেই সর্বজনগ্রাহ্য হয়। সেই থেকে পাড়াটি ‘পট্টি’ হয়ে যায়।
পাড়াটির একটা কেতাদুরস্ত নাম ছিল : ‘লালালজ’। যদিও সেই নামে কাউকে কোনোদিন ডাকতে শুনিনি। সরকারি দপ্তরেও একটি নাম ছিল। সেটি আরো ভারিক্কি : এ. বি. গুহ রোড (সংক্ষিপ্ত নামের পূর্ণরূপ অনাথবন্ধু গুহ রোড)। গভর্নমেন্টের হোল্ডিং বোর্ড কিংবা হলুদ খামে আসা চিঠি ছাড়া এর ব্যবহার তেমন একটা চোখে পড়তো না।
আমার জন্ম ওই পাড়াতে। আমার বাবার জন্মও তাই। বড় হয়ে একদিন হঠাৎ শুনি, আমরা ওখানকার কেউ নই। বিত্তশালী সুরুজ্জামান মিয়া ও আমাদের পাড়ায় আশ্রিত দবির হোসেন ভূঁইঞা একদিন দাবি করেন, ওই পুরো পাড়াটিই নাকি তাদের। যুগ যুগ ধরে সেখানে বাস করা নিম্ন বর্ণের ও পেশার দরিদ্র হিন্দুরা সেই অসমশক্তির কাছে একসময় পরাস্ত হয়। ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে পাড়াটি ছাড়তে হয় আমাদের। হিন্দু অধ্যুষিত সেই এলাকাটিতে আমাদের মতো আরো ৩৫টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয় একযোগে। আমাদের পরিবারের ঠাঁই হয়, পাশের রামবাবু রোডের জেঠার বাড়িতে। সেদিন থেকে নিজভূমে পরবাসী হয়ে পড়ি সবাই। আমার রক্তের সঙ্গে মিশে থাকা পরম আত্মীয় ‘অশিষ্ট’ সেই পট্টিটি এক সন্ধ্যায় প্রতিবেশী ‘পাড়া’ হয়ে যায়। ফেলে আসা সেই প্রতিবেশীর কাছে বারবার ফিরে যাওয়ার তাড়া হয়তো আমৃত্যু বয়ে যাবো; পৌঁছানো হবে না।
স্মৃতি আজও কাঁদায়
ভোলানাথ পোদ্দার (লেখক,অবসর প্রাপ্ত ব্যাংকার)
আমি তখন ছোটো। গ্রামের সবুজ শ্যামল মাঠ দিয়ে প্রতি বিকালে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াই। তখন বাবা-মা বেঁচে আছে, মনে কতো আনন্দ। প্রতিদিন স্কুলে যাই বাড়িতে আসি এবং বিকেলে খেলতে যাই। দেশ ভাগের কষ্ট তখন প্রকট ভাবে চলছে। আমার খেলার সাথী অনেকেই মা-বাবার সঙ্গে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমাদের পাশের বাড়িতে অঞ্জলি নামে একটি মেয়ে ছিলো, ও প্রতিদিন আমার সঙ্গে খেলার জন্য আসতো। আমাকে নিয়ে মিছামিছি রান্না করা, পুতুল বিয়ে দেয়া এগুলি নিয়ে খেলতো।
মেয়েদের খেলা আমার মোটেই ভালো লাগতো না। অন্য-কনো উপায় না থাকায় আমি বাধ্য হয়ে অঞ্জলির সঙ্গে খেলতাম। বাবা মাঠে খেলতে যেতে দিতো না, এজন্য অঞ্জলি হয়ে ওঠে আমার একমাত্র খেলার সাথী। সে সময় ধর্মে ধর্মে এতো ভেদাভেদ ছিলো না, আমরা হিন্দু মুসলিম ছেলে মেয়েরা মিলে মিশে রাম দিয়া , ওড়াকান্দি পূজা দেখতে যেতাম, আবার দুর্গা পূজার মেলা ও দেখতে যেতাম। ঈদের সময় কালা মিয়া চাচা নিমন্ত্রন দিতো আমরা ঝাক বেঁধে যেয়ে খেয়ে আসতাম।
এসময় আমাদের বাড়িতে ভয়াবহ ডাকাতি হয়,এলাকার মানুষ দল বেধে আমাদের দেখতে এসেছিলো। ভয়ে রাতে আমরা ঘুমাতে পারতাম না।প্রতি রাতে গভীর রাত পর্যন্ত অঞ্জলি আমার নিকট বসে থাকতো, তারপর ওর বাবা এসে ওকে নিয়ে যেতো। গ্রামের মানুষ তখন আমাদের বাড়ি সারা রাত প্রহরা দিতো। তবু বাবা জন্ম ভিটা ছেড়ে কোনোদিন দেশ ত্যাগ করতে চায়নি।
ঈদুল ফিতরের নিমন্ত্রণ থাকতো আমাদের, কালা মিয়া চাচা নিমন্ত্রন দিতো আমরা সবাই মিলে খেয়ে আসতাম, সে ছিলো ভিন্ন এক আনন্দ। সন্ধ্যার পর অঞ্জলি বলছে দেখো আমার মা-বাবা গভীর রাতে আলোচনা করেছে আমরা যে কোনো দিন ভারত চলে যেতে পারি। সেটা আজকে রাতেও হতে পারে। আমাদের জায়গা বাড়ি তোমার বাবার নামে রেষ্ট্রি করে দিয়েছে। তোমাকে আরো একটি কথা বলি,তোমাদের অনেক টাকা এজন্য অন্য লোক দিয়ে বাবা তোমাদের বাড়ি ডাকাতি করেছে। গভীর রাতে বাবা মায়ের সঙ্গে এ-সব কথা বলেছে আমি শুনেছি। এজন্য আমার সারাক্ষণ মন খারাপ থাকে। আমার তো কিছু করার নাই।
আমি বললাম আমরা দু'জনই ছোট, ডাকাতি হয়েছে ওটা বড়দের ব্যাপার, তুমি আমাকে ফেলে চলে যেয়ো না, আমি একদম একা হয়ে যাবো। অঞ্জলি তখন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে বলেছিল তোমাকে ছেড়ে গেলে আমি মরে যাবো। তারপরও মা-বাবার সঙ্গে তো আমাকে যেতেই হবে। সন্তান দের কোনো ব্যক্তিগত ইচ্ছা থাকতে নেই। সেদিন অঞ্জলির কথাগুলি শুনে আমার ও বুকভেঙে কান্না এসেছিলো, ছোট বয়সের মানুষের কান্নার কোনো দাম নেই তাই কাঁদতে পারিনি।
সন্ধ্যার দিকে কালা মিয়া চাচা এসে ঈদের নিমন্ত্রণ দিয়ে গেলো আমাদের পরিবার এবং অঞ্জলিদের পরিবার কে। প্রতিবছর আমরা একসঙ্গে ঈদের নিমন্ত্রণ খেতে যাই। এবারও ইচ্ছে হলো আমরা দু’পরিবার মিলে একসঙ্গে খেতে যাবো। কিন্তু অঞ্জলি যে বললো তাদের দেশত্যাগ আজ রাতেও হতে পারে। অর্থাৎ ইচ্ছেটা সারাজীবনের জন্য অপূর্ণই থেকে যেতে পারে। মা-বাবা যেখানে ঘুমাতো তার থেকে একটু দূরে আমি আর আমার ইমিডিয়েট বড়ো ভাইটা ঘুমাতাম (ভাইটা আমার প্রয়াত)।
আমার ঘুম আসছে না, অঞ্জলির কথা বারে বারে কানে বাজছে।ভাবছি ওর কথা যদি সত্যি হয় তাহলে পৃথিবীতে আমি একা হয়ে যাবো। গভীর রাতে আমি টের পলাম বাবা বাইরে যাচ্ছে। সে-সময় এমনই ছিলো বাড়ির বয়স্করা গভীর রাতে উঠে বাইরে গিয়ে পুরো বাড়ি ঘুরে দেখে আসতো। তাদের হাতে থাকতো টর্চ লইট এবং সড়কি। তাতে চোর ডাকাত ভয়ে আসতো না।
কিছু সময় পরে বাবা বাইরে থেকে এসে মাকে ডাকছে। ভয়ে আমার গা শিউরে উঠলো। আমি বুঝতে পারলাম অঞ্জলিরা দেশত্যাগ করে চলে গেছে এ সংবাদটি বাবা এখনই মাকে বলবে। বাবা বলছে দেখো বৈকন্ঠ আর নিল কন্ঠ (অঞ্জলির জেঠু এবং বাবা) ঘরে আলো জ্বেলে রেখে চলে গেছে। আমার বড় ভাইদের বাবা ডাকলো আমরা সবাই মিলে অঞ্জলি দের পরিত্যক্ত ঘরে গেলাম, আমার অন্তর ভেঙ্গে যাচ্ছে অঞ্জলির জন্য। এই জীবনে হয়তো কোনো দিন ওর সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।
পরদিন সবাই ঈদের নিমন্ত্রণ খেতে গেলো, আমি গলাম না। কি কারণে গেলাম না,ছোট্ট হৃদয় দিয়ে কাউকে বোঝাতে ও পারলাম না। মা বাবাকে বললো থাক,আমি আর ও বাড়িতে থাকি তোমরা যাও ঈদের নিমন্ত্রণ খেয়ে আসো। দীর্ঘদিন আমার চোখে ঘুম ছিলো না, কি কারণে ঘুম ছিলো না কেউ বুঝতে পারেনি,কারণ আমি ছোট মানুষ,ছোট মানুষের এতো হৃদ্যতা থাকতে নেই।
এরপর কতো কিছু ঘটে গেলো বাংলার পথে প্রান্তরে। কতো জল বয়ে গেছে পদ্মা, মেঘনা আর মধুমতী দিয়ে। প্রায় ৫০ বছর পর আমি আমার স্ত্রী কে নিয়ে ভারত গিয়েছি বেড়াতে। আমি এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে যাবো আর এক আত্মীয়ের বাড়ি। বাসে উঠেছি,প্রচন্ড ভীড়। আমরা কোন মতে দুটি সীট পেয়ে বসেছি। কলেজের ছেলে মেয়েরা এমন ভাবে ঠেসে দাঁড়িয়েছে আমার স্ত্রীর দুশ্চিন্তা কি হবে আমার স্বামীর! আমার খুব মঝা লাগছিলো, অনেক দিন পর মেয়েদের খুব নিকট সান্নিধ্য পাচ্ছি এজন্য। এমন করেই আমরা নামলাম রানাঘাট। আমি এবং আমার স্ত্রী দু'জনে দুটি ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি রেলস্টেশনে।
হঠাৎ দুজন পুলিশ অফিসার এসে আমাকে বলছে আপনি কোথার থেকে এসেছেন। আমি বললাম বাংলাদেশ থেকে এসেছি। ওরা বললো আপনাদের পাসপোর্ট দেখান।আসলে এটি একটি ধান্দা। পাসপোর্ট নিকটে না থাকলে কিছু টাকা নেবে, আর টাকা না দিলে অযথা হ্যারাস করবে।আমার স্ত্রী কে বললাম তুমি পাসপোর্ট বের করো। পুলিশদের বললাম লাল গলা ট্রেন আসছে, এটি কি পলতা যাবে?
হঠাৎ একটি মেয়ে পুলিশ এলো আমার পাশে,পুরুষ পুলিশ দুজনকে বললো স্যার আমি আঙ্কেল কে চিনি। ওনাদের পাসপোর্ট দেখতে হবে না। আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ভাবলাম একে-তো জীবনেও দেখিনি, না-কি এটি কোনো নূতন প্রতারণার ফাঁদ ! আমি লক্ষ্য করলাম মেয়েটি একজন বয়স্ক মহিলার দিকে তাকাচ্ছে। তিনি স্টেশনে বসে দূর থেকে কি যেনো ঈঙ্গিত করছে।ওখান দিয়ে একটু আগে আমরা হেটে এসেছি। লালগোলা ট্রেনটি এসে ভীড়লো,মেয়েটি ভিড়ের ভিতর আমাদের বসার জায়গা করে দিয়ে নিচে নামলো।
ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো, মেয়েটি গার্ড অব অনারের মতো জানিয়ে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল ঐ আমার মা অঞ্জলি ,তোমার এক সময়ের খেলার সাথী। আমি ট্রেন থেকে তাকিয়ে দেখলাম স্টেশনের বেঞ্চে বসা একজন বয়স্ক মহিলা হয়তো তার মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, পাশাপাশি একসময়ের জীবনের সাথীকে সে চিনে ফেলেছে, আমি তার সামনে দিয়ে হেটে এলেও তাকে চিনতে পারিনি। জানি এখানেই শেষ, আর কোনো দিন হয়তো অঞ্জলির সঙ্গে এই জীবনে দেখা হবে না।
সেই মেয়েটা
রুমা মোদক (লেখক নাট্যকার )
মেয়েটাকে দেখে প্রথম দিনই চমকে উঠেছিলাম আমি। থ্যাবড়া নাক,পুরু ঠোঁট, ছোট ছোট পাহাড়ি চোখ।সবকিছু মিলিয়ে কি যে মায়াবী। অদ্ভুত আকর্ষণীয়। গায়ের রঙ গমের মতো উজ্জ্বল। সবচেয়ে আকর্ষনীয় তার আপন করে নেয়ার ক্ষমতা। ঘন্টা খানেকের আলাপে মনে হলো কতো জনমের পরিচিত।
দ্বিতীয়বার ঢাকা বাসে যখন ক্যাম্পাসের বন্ধুদের সঙ্গে তৈরি হয়েছে যোজন দূরত্ব, কে কোথায় কীভাবে আছে জানতামই না তখন এই মেয়েটিই হয়ে উঠেছিলো সার্বক্ষণিক সঙ্গী।
না এতোগুলো বছর পর ওর নাম বলাটা ঠিক হবেনা। আমি তখন শফিক রেহমানের যায়যায়দিন প্রতিদিন ট্যাবলয়েডে চাকরি নিয়ে ঢাকায় গিয়েছি। অস্থায়ী আবাস আরামবাগ কিউটের গলির একটি পাঁচতলা ভবন। প্রতিবেশি মেয়েটি গায়ে পড়েই পরিচিত হতে এসেছিলো প্রথমদিন।
কোন কলেজ ঠিক মনে নেই তখন অনার্সে পড়তো ও,কমার্সের কোন সাবজেক্টে। ধীরে ধীরে প্রতিবেশী পুরো পরিবারের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা হয়,জানা হয় ।তিন বোন এক ভাইয়ের পরিবারে বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি। খুব বড় পদে ছিলেন না বুঝা যেতো লিভিং স্যান্ডার্ড দেখে। প্রতিদিন অফিস শেষে গল্প হতো ওর মা বোনদের সঙ্গে।
আর প্রায় বিত্তহীন এক ঘরে বেমানান সুন্দরী মেয়ে ও। ওর সৌন্দর্যটা এমন ছিলো, যে আলাদা করে বলার মতো কিছু নেই কিন্তু সব মিলিয়ে একশোজনের মধ্যে চোখে পড়ার মতো। এস এস সি ইন্টারে স্ট্যান্ড করা ছাত্রী। মেধার দীপ্তি ঝলমল করতো চোখেমুখে।
আমি প্রতিবেশী হবার পর সারাক্ষণ লেপ্টে থাকতো আমার সঙ্গে। বাজারে মাছ কিনতে যাবো,ও সঙ্গী। ডাক্তার দেখাতে যাবো ও সঙ্গী। ঘুমাতো আমাদের ঘরে,ডাল ভাত সবজি যাই রান্না হোক খেতো আমাদের সঙ্গে। বলতো অভাব অনটনের ঘরে সারাক্ষণ অশান্তি ওর ভালো লাগেনা নিজেদের ঘরে ফিরতে। আমরা শুনতাম প্রতিবেশীর ঘরে মা বাবা ভাই বোনদের সারাক্ষণ হল্লাচিল্লা লেগেই থাকতো। আমি ওকে আগলে রাখতাম,বলতাম থাকো আমার সঙ্গে।আমিও তখন ঢাকায় একা থাকি। আমার পুরো পরিবারের সঙ্গে মিশে গেলো মেয়েটা,পরিবারের একজন হয়ে। আমার মায়ের সঙ্গে কতো জায়গায় গেছে আমার জন্য বর দেখতে!
চলতে ফিরতে ওকে আবিষ্কার করতাম জানতাম ওর এম্বিশন। অর্থ বিত্ত প্রতিষ্ঠায় উন্নত জীবনের স্বপ্নের সঙ্গে ওর বর্তমান অবস্থানের আকাশ পাতাল ফারাক। ও পথ খুঁজতো,কোন পথে গেলে ওর কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবে। ঘুলঘুলাইয়ার মতো নানা চক্করব ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হতো।
তখন একদিন হঠাৎ জানলাম ও এক ছেলের সঙ্গে প্রেম করছে। পরিচয় করিয়ে দিলো আমার সঙ্গে। প্রথম দর্শনে ভালো লাগলোনা ছেলেটিকে,কেন যেনো। ওর মতো মেয়ে প্রতিষ্ঠার নেশায় একা একা ঘুরে বেড়ায় সুতরাং পুরুষের ফাঁদে পড়া অস্বাভাবিক নয়। বলেছিলাম ওকে কথাটা। উত্তরে ও বলেছিলো, ছেলেটি বলেছে এজন্যই সে বিয়ে করতে চায়৷ ছেলেটি নাকি বলেছে কোন সাহসে এমন একটা মেয়েকে ওর বাবা মা একা ছেড়ে দেয়? কেমন বাবা মা?
আমি শুধু বলেছিলাম,বিয়ে করার আগে ভেবো।যে ছেলে বিয়ে করার আগেই তোমার বাবা মাকে দোষারোপ করে সে ভালো ছেলে হতে পারেনা…।
তারপর আমি চলে এলাম এই সরকারি চাকরিতে। আরামবাগ কিউটের গলির বাসাটা ছেড়ে দিলাম। অনেকদিন যাওয়া হয়না। ওর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তখন মোবাইল নেই,নেট নেই। প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা।মাঝে মাঝেই মনে পড়তো ওকে। ভাবতাম এবার ঢাকা গেলে ওর খোঁজ করবো।
কয়েকবছর পর হঠাৎ একদিন ওকে আবিষ্কার করলাম পত্রিকার পাতায়। তাও ওর মায়ের চুল দেখে। সব সাদা হয়ে যাওয়া চুল ওর মা মেহেদী দিয়ে লাল করে রাখতো। হুমড়ি খেয়ে দেখলাম ছবিটা। হ্যা ওর মা। ওর মুখটা দেখা যায়না। কফিনে শুয়ে আছে। খবরটি জানাচ্ছে ঘরের সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে,সাতমাসের গর্ভবতী ছিলো সে…। হত্যার অভিযোগে বরকে গ্রেফতার করা হয়েছে…।
আজ পর্যন্ত আমার আর যাওয়া হয়নি আরামবাগ, কিউটের গলি…।
হাতমোজা জোড়ার একটি এখানে ফেলে যাব
অমিতরূপ চক্রবর্তী (কবি ও লেখক)
ডিসেম্বরের শীতে দার্জিলিং খাঁ খাঁ করে। সব ইস্কুল-কলেজ বন্ধ। হোটেলগুলো খালি। রাস্তাঘাটে লোকজনও কম। প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যে নামতে না নামতেই সিমেন্টের ধুলোর মতো কুয়াশা দেওয়াল তৈরি করে দাঁড়িয়ে পড়ে। পথবাতির আলো ঘোলা ঘোলা হয়ে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে চুপ করে থাকে।
২০০৫ সাল হবে। আমারই এক অসমবয়েসি বন্ধু দার্জিলিঙের বে-সরকারি বিএড কলেজ থেকে বি-এড করছে। ওর ফাইনাল সেমিস্টার। অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। কয়েকটি ক্লাসও অ্যাটেন্ড করতে হবে। ও যখন আমাকে বললো ‘চল, দার্জিলিঙ বেড়িয়ে আসবি’ আমি এক কথায় ওর সঙ্গে ঝুলে পড়লাম।
শিলিগুড়ি তেনজিং নোরগে বাসস্যান্ডের উল্টোদিকে দার্জিলিং যাবার ছোট গাড়িগুলি ছাড়ে। এই গাড়িগুলি পাঙ্খাবাড়ি হয়ে দার্জিলিং পৌঁছায়। আমরা চেপেছিলাম একটি মাহিন্দ্রা জিপে। জিপটা দার্জিলিঙে পৌঁছলো সন্ধ্যের পর।
যে-হোটেলে আমরা উঠেছিলাম, সেটার থেকে ম্যালের দূরত্ব প্রায় কুড়ি মিনিট। দার্জিলিঙে জমিয়ে দেবার মতো ঠাণ্ডা। গোটা হোটেলবাড়িটা শুনশান। মাথায় হোর্ডিং-এ আলো জ্বলছে। কাউন্টারে একজন বেঁটে, বাহারি দাড়িসমেত ভদ্রলোক। পরে জেনেছিলাম তিনি বাঙালি খ্রীস্টান। গোমস বোধহয় ছিলো ভদ্রলোকের পদবী। হোটেলে আমরা ছাড়া ছিলে আরও একটি পরিবার। ভদ্রলোক স্ত্রী, মেয়ে, জামাই নাতি-নাতনিসহ সম্ভবত ইয়ার্লি ট্যুরে এসেছেন। আমাদের ঘর থেকে কয়েকটি ঘর পরেই দুটি ঘর দখল করে ছিলো ওরা। আমাদের এই ক’জন ছাড়া আরও একজন প্রতিবেশী ছিলো। যার উপস্থিতি তখন আমি টের পাইনি। পেয়েছিলাম পরে। সহসা।
অন্ধকার ভোরে যে পর্দা নামানো একটি গাড়ি আমাদের হোটেল থেকে টাইগার হিলে নিয়ে যাবার জন্য এসেছিলো, তার সামনের সিটে আমার পাশে উঠে বসেছিলেন সেই পড়শি। বেঁটে, সিড়িঙ্গে চেহারার একজন লোক। গায়ে বোঝাই গরম পোশাকের সঙ্গে হাতে সাদা ও সবুজে স্ট্রাইপ দেওয়া হাতমোজা। লোকটির সমস্ত বেশভূষার মধ্যে এই হাতমোজা জোড়া এমনই বেমানান ছিলো যে, সহজেই লোকটির দিকে চোখ যায়। তিনি আমার পাশে গাদাগাদি করে উঠলেন। মনে হলো গাড়ির ভেতরকার ভ্যাপসা অন্ধকারে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেনও একটু।
কীভাবে যে ওর সঙ্গে কথা শুরু হয়েছিল মনে নেই। যা মনে আছে তা হলো, সূর্যোদয় দেখার ব্যাপারে ওর ক্ষ্যাপামি। আমাকে বললেন ‘বহু জায়গায় আমি ঘুরেছি। বলতে পার, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীকা- কোথাও বাদ নেই। কিন্তু আশ্চর্য হলো, কোথাও আমি সানরাইজ দেখতে পাইনি। বহু চেষ্টা করেছি, সূর্যোদয় আমার চোখে ধরা দেয়নি। এবার আমার শেষ চেষ্টা। যদি টাইগার হিল আমাকে সানরাইজ দেখাতে পারে, আমার এই হাতমোজা জোড়ার একটি এখানে ফেলে যাব।‘
ওই শীতে পাহাড়ের মাথায় কী প্রচণ্ড ভীড়। কয়েকটি ছেলে ভীড়ে বিলি কেটে কেটে গরম চা বিক্রি করছে। ভদ্রলোক আমার ঠিক পেছনেই ছিলেন। হাওয়ার ঝাপটে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকাও সম্ভব হচ্ছিলো না। অবশেষে শুরু হলো সেই স্বর্গীয় প্রদর্শনী। প্রায় আধঘন্টা ধরে। কাঞ্চনজঙ্ঘা যখন হলদে-সোনালী হয়ে গেলো, আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আমার সেই পড়শি উধাও। পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে যেখানে অন্য সব গাড়ির সঙ্গে আমাদের গাড়িটা দাঁড়িয়েছিলো, তার একপাশে পাহাড়ের খাড়া দেওয়াল। দেওয়াল ও রাস্তার সংযোগে কয়েকটা বুনো ফুলের ডাঁটি। সেখানে পৌঁছে দেখলাম, প্রতিবেশীর সাদা ও সবুজে স্ট্রাইপ দেওয়া হাতমোজার একটি অনন্তেরও অতীত কারও উদ্দ্যেশ্যে সেখানে পড়ে আছে।
সিলেটের মানুষ শুধু ধনী নয় খুব ভাল মনের হয়
শামীমা জামান (লেখক)
‘ওই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না যার দারা তার প্রতিবেশি কস্ট পেয়েছে’। প্রতিবেশির অধিকারের বিষয়ে প্রফেট মুহাম্মদ (সঃ) এতোবেশি তাকাদা দিতেন যে তার সাহাবীরা এক সময় ভাবতে লাগলো না জানি সম্পত্তিতেও প্রতিবেশীর ভাগের কথা এসে যায়। বস্তুত প্রতিবেশি পরমাত্মীয়, প্রতিবেশিই সমাজ। আমার প্রতিবেশি ভাগ্য খুব ভালো। আমি যে ভালবাসার যোগ্য নই সেই ভালবাসাই পেয়েছি প্রতিবেশিদের কাছ থেকে। অনেকের অনেক গল্পই করা যায়। ছোট বেলাতো প্রতিবেশিদের নিজের পরিবারের এক অংশই মনে হতো তাই পাশের বাড়ির লিতাদের বাড়ি আর আমাদের বাড়ির মাঝখান দিয়ে একটা দরজা কেটে দিতে মন চাইতো। লিতার মায়ের নাম ছিলো রোজ।গোলাপের মতোই সুন্দরী ছিলেন তিনি।রোজ মামির রান্না ছিলো অসাধারণ।বিকেলে আমাকে বাগে পেলে তিনি গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে টেনেটুনে টাইট করে চুল বেঁধে দিতেন।ওরকম চুল বাঁধলে নাকি চুল লম্বা হয়। এক সময় ভাড়া বাসা ছেড়ে তারা নিজেদের বাড়িতে উঠলো, সে নতুন বাসা গোছানোর আগেই রোজ মামির পাকস্থলীতে ক্যান্সার হলো। আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মারা গেলেন।সেই মৃত্যু ছিলো আমার প্রথম কাছ থেকে দেখা কোন আপন জনের মৃত্যু।আজ আমার ও ক্যান্সার। ৩০বছর দেখা নাই,কথা নাই অথচ সেই বাড়ির মানুষগুলো আমার সেরে ওঠা নিয়ে কি উদ্বিগ্ন।তাদের দোয়াতে আছি আমি। তারা ছিলো আমার শৈশবের প্রথম প্রতিবেশি। এখন যাদের কথা বলবো তারা আমার বর্তমান প্রতিবেশি। এই ভীনদেশে কখনোই অনুভব করিনি আমার পরিবার এখানে নেই। হাছনাত ভাই আর ইয়াসমিন ভাবি। বেহেশতের মানিকজোড় তারা। এতো সুন্দর সুখী দম্পতি খুব কম দেখেছি। চাদের মতো একটি মেয়ে আর একটি ছেলে তাদের। সুখে দুঃখে শুধু তাদের দুজনকেই নয় পাশে পেয়েছি তাদের বৃহত্তর পরিবারের সকলকে। একটি পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষই ইতিবাচক হয় কিভাবে সেও এক বিস্ময়। এই যে নোয়াখালী কুমিল্লার মানুষ বা নানান দেশের মানুষ নিয়ে যে মানুষের নানান প্রবাদ গড়ে উঠেছে তা বুঝি এভাবেই হয় আজ যেমন আমার মনে তৈরি হয়েছে সিলেটের মানুষ শুধু ধনী নয় খুব ভাল মনের হয়।
এখনও মানুষই আমাকে টানে
ইশরাত শিউলী (ফিল্মমেকার, লেখক)
আমার ছেলেবেলা কেটেছে ঢাকার সেগুন বাগিচায়। তখনো এ অঞ্চলে বাড়ি-ঘর তেমন ওঠেনি, চারিদিকে খোলা মাঠ, বিকেল বেলা পাড়ার ছেলেমেয়েরা সেখানে খেলতাম, বৌচি, গোল্লা ছুট, দাড়িয়াবান্ধা। শীতের দিনে বড়রা মানে আমাদের পাড়ার আপু ভাইয়ারা ব্যাডমিন্টন খেলতো। মেয়েরা বিকাল থেকে সন্ধ্যা। ছেলেরা সারারাত ব্যাপী ম্যাচ খেলতো। আমরা কখনো- সখনো খেলার সুযোগ পেতাম, দুধ ভাত হিসেবে! যে বাড়টিতে আমরা থাকতাম সেটি ছিলো বেশ পুরোনো,তিন তলা বাড়ি। বাড়িতে পাঁচটি পরিবার বাস করতো।তখনো ফ্ল্যাট বলার চল হয়নি। আমরা বাসা বলতাম। আমার নানু বলতেন পাখির বাসা, কারণ তিনটা মাত্র রুমের মধ্যে অনেক মানুষ একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকতে হতো। তখনকার সময় মানে আশির দশকের শুরুর দিকে বেশীর ভাগই ছিলো যৌথ পরিবার। আমাদের বাসা ছিলে দোতলার সামনের দিকে। পেছনের দিকে রুপাদের বাসা। রুপাদের সঙ্গে আমাদের বেশ হৃদতা ছিলো। ভালো-মন্দ রান্না হলে এবাসায় ওবাসায় দাওয়াত থাকতো। শুঁটকী ভর্তা আম ভর্তার আদানপ্রদান ছিলো হর হামেশা! হুট করে কারো বাসায় মেহমান চলে এলে গামলা ভরে ভাত তরকারি এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে আনিয়ে নেয়া হতো। নীচের তলার সামনের দিকে থাকতো সুইটি আপুরা। তারা তিন ভাই বোন। সুইটি আপুর মা ভীষণ রাগী ছিলেন। প্রতিদিন তিনি তার ছেলেদের ধরে বেদম পেটাতেন। ওদের চিৎকারে আশেপাশের মানুষ জড়ো হয়ে যেতো। কেউ বাঁধা দিতে গেলে বা এভাবে বাচ্চাদের মারা উচিৎ না বোঝাতে গেলে তিনি আরো রেগে যেতেন। পাড়া প্রতিবেশীরা বলাবলি করতো, ছেলেগুলো বোধ হয় উনার সৎ ছেলে। সুইটি আপুকে অবশ্য পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখতেন তার মা। তার গায়ে কখনো ফুলের টোক্কাটিও পড়েনি! সে দেখতেও খুব মিষ্টি ছিলো! তার মা তাকে পাড়ার কারো সঙ্গে মিশতে দিতেন না। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতেও দিতেন না,তবে আমরা সিঁড়ি দিয়ে উঠতেও নামতে সুইটি আপুকে দেখতাম। তার মা আশেপাশে না থাকলে টুকটাক কথাও হতে, এই যেমন আপু কি করো? উত্তর আসতো, ম্যাগাজিনের ছবি কাটি। ছবি দিয়ে কি করবা? আঠা দিয়ে খাতায় সাজাবো। জানলার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতাম কিভাবে সে ছবি কেটে আঠা দিয়ে বড় একটা খাতার মধ্যে সাজিয়ে রাখে! বাসায় এসে আমিও ছবি কাটার চেষ্টা করতাম! একবার ব্লেড দিয়ে আম্মার পুরনো বিচিত্রার ছবি কাটতে গিয়ে আঙ্গুল কেটে ফেলেছিলাম! রক্তে ঘর ভেসে যাচ্ছে,আম্মা রক্ত দেখে ফিট। ছোট মামা আমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে ব্যন্ডেজ করে এনেছিলো! এই ঘটনারনার পর আমি আর কখনো ছবি কাটার চেষ্টা করিনি! সুইটি আপুদের বাসায় আমরা কখনে যাইনি, তারাও কখনো আসেনি আমাদের বাসায় ! নীচের তলার অন্য পাশে ছিলেন একটি খৃষ্টান পরিবার, মি. ফ্লিপ রোজারিও ও মিসেস ঝর্ণা রোজারিও। পুরো বিল্ডিংয়ের মধ্যে, এই পরিবারটি ছিলো ভীষণ পরিচ্ছন্ন! ঘরে, বারান্দায় একচিমটি ময়লা নেই কোথাও। আমার নানী বলতো নান্টুর মার ঘরে সুই পড়লেও খুইজ্জা পাওয়া যায়, আর বাথরুমটা দেহ এতো ঝকঝকা ঐখানে বইসা ভাতও খাওন যাইবো। তাদের ড্রইং রুমটা সবসময় ছিমছাম সাজানো থাকতো। দেয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর ছবি। একটা সাদা কালো যুবক রবীন্দ্রনাথ। গেরুয়া পরা বিবেকানন্দ। কবি কাজী নজরুল ইসলাম।দেয়ালের তাক জুড়ে অনেক বই, পুরোনো বাইবেল, গীতবিতান,সঞ্চিতা, ব্যাথার দান,শরৎ রচনাবলী, দস্যু বনহুর আরও অনেক লেখকের বই ছিলো সেখানে। আম্মা ঐ বাসা থেকে বই এনে পড়তো।আর শরৎচন্দ্র পড়তে পড়তে কেঁদে বুক ভাসাতো! পরবর্তী সময়ে আমিও ওদের বাসা থেকে দস্যু বনহুর, কিশোর থ্রিলার, মাসুদ রানা এনে পড়েছি। উনাদের দুই ছেলে নান্টু আর মিন্টু। দু'জনই মিশনারীতে পড়তো। ছোট ছেলে নান্টু ছিলো আমার বয়েসী। তাই ছোট বেলায় নান্টু ছিলো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমরা এক সঙ্গে গান করতাম, কবিতা পড়তাম। আমাদের দুজনের শত শত ছড়া মুখস্ত ছিলো। নান্টুর মায়ের সঙ্গে আম্মার খুব ভাব ছিলো। দুজনে মিলে নানা রকম রান্নার এক্সপেরিমেন্ট করতেন।আমরা জীবনে প্রথম নুডুলস খেয়েছিলাম নান্টুদের বাসায়। আম্মা আর আন্টি দু’জনে মিলে কেক বানাতো পুডিং বানাতো, চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মতো স্যুপ, আরো কতকি! অত কিছু মনেও নেই এখন। আমরা ওদের বাসায় গেলেই আমাদের জেলি দিয়ে পাঁউরুটি খেতে দিতো। সেই দেখাদেখি আমাদের বাসায়ও পাউরুটি জেলির চল শুরু হলো। আগে আমাকে স্কুলের টিফিন দেয়া হতো আটার রুটির মধ্য চিনি দিয়ে রোল করে, অথবা লুচির সঙ্গে চিনি দিয়ে, তা পরিবর্তন করে জেলি রুটি, নয়তো নুডুলস , কেক, দেয়া শুরু হলো। আমার খাবার দেখে অন্য সহপাঠীরা হা করে তাকিয়ে থাকতো। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করতো তুই এইরকম খাবার কই পাসরে? আমি বলতাম, আমার আম্মায় বানায়া দেয়। ওরা অবাক হয়ে বলতো, তোর মা এইসব বানাইতে পারে?আমি বলতাম, হুহুহুম পারে। নানা ধরনের খাবার তারা পাড়া প্রতিবেশীদের বাড়িতেও বিলাতো। ট্রের মধ্যে ঝকঝকে কাচের বাটিতে, বাঁশের জালি দিয়ে ঢেকে মিন্টু দিয়ে আসতো। প্রতিবেশরা আবার সেই খাবার লুকিয়ে ময়লার টিনে ফেলে দিতো। তারা আমার নানীর সঙ্গে গল্প করতো খৃষ্টান ঘরের খাবার খাইতে আমগো ঘিন্না লাগে। ঐ খাওন খাইলে দোজখে যাইতে হইবো,তাছাড়া তারাতো পেশাব কইরান পানি লয়না। কাজের বুয়ারাও এসব খাবার নিতে চায়না। ওদের সঙ্গে আপনেরা এতো মিশেন ক্যান? ওরা কিন্তু ধইরা নিয়া গিয়া জোর কইরা খৃষ্টান বানায়া দিবো গির্জায় নিয় কোরান শরীফ পায়ের নীচে দিয়া খৃষ্টান বানাইয়া ফালায় জানেন। ওদের এসব বাজে কথায় নানী খুব বিরক্ত হতেন। ওরা চলে গেলেই নানী বিরক্তিটা প্রকাশ করতেন, নিজেগো তো বাড়িঘর নোংরায় ঠাসা। বাথরুমটাও কোনোদিন পরিস্কার করেনা। ঘরের ভিতর গু মুতের গন্ধ !তারা আইছে আরেক জনরে নিয়া কইতে অসভ্য জানি কোথাকার!
নান্টুর মাকে আমরা ডাকতাম আন্টি বলে। আম্মা আর আন্টি মিলে কত রকমের শেলাই কাজ করতো। বিচিত্রায় কাটিং দেখে নতুন নতুন ডিজাইনের ব্লাউজ বানাতো ।বাচ্চাদের জামা বানাতো। জামায় আবার ক্রুশকাঁটা দিয়ে লেস বানিয়ে লাগাতো। , ঝর্ণা আন্টির তো মেয়ে ছিলোনা নতুন জামাগুলে সব আমার হয়ে যেতো। তাই দুই ঈদেই আমার নতুন ডিজাইনের অনেকগুলো জামা হতো। আমার যতটুকু মনে পড়ে, সেই সময় খুব লোডশেডিং হতো। আমাদের সব বাসায় রাতের বেলা হারিকেন জালানো হতো। হারিকেন ধরানোটা খুবই হ্যাপা ছিলো। কাঁচ পরিস্কার করে কেরোসিন তেল ভরতে হতো, ফিতা শেষ হয়েগেলে ফিতা ভরা বেশ ঝক্কির কাজ।
কারেন্ট চলে গেলে ঝর্ণা আন্টিদের বাসায় একটা ল্যাম্পো জালানো হতো ফ্লিপ আঙ্কেল ইংরেজ অফিসের হিসাব রক্ষক ছিলেন, সেখান থেকে অনেক আন কমন জিনিস আনতেন যা আমরা সাধারণত দেখতে পেতাম না। তো এই ল্যাম্পোগুলো ছিলো সে রকম একটি। অনেকটা ফুলদানীর মতো একটি লম্বা কাঁচের গ্লাস লোহার রডে লাগানো ছিলো। রডের নীচে ছোট্ট একটা খুপরি মতো সেখানে তেল ঢাললে কয়েকদিনের মজুত থাকে প্রতিদিন তেল ঢালার হ্যাপা নেই। সেই ল্যাম্পোর কাঁচ বিশেষ ভাবে তৈরি সেখানে কখনোই কালী পড়েনা। মোছামুছির ঝামেলাও নেই। তাদের বসার রুমের সোফাগুলোও ছিলো ইউনিক। বেতের সোফার মধ্যে শীতল পাটির লাগানো। আলাদা করে গদি আঁটা নেই ফলে সোফার ডিজাইনের কারণে ঘরের একটা আলাদা শোভা তৈরি হয়েছিলো মনীষীাদের ছবি,থাকে থাকে বই আর শীতলপাটি মোড়া বেতের সোফা সব মিলিয়ে ঘরে সৌম্য ভাব এসেছে। ঘরে ঢুকলেই মন ভালো হয়ে যায়। এতো গেলো নান্টুদের কথা।
আমাদের তিন তলায় ছাদ সংলগ্ন তিন রুমের বাসায় থাকতো, অন্জনা দি মাসিরা। অন্জনাদি মাসির বাবা ঋষি নানা ছিলেন আমার নানুর বন্ধু। তাঁর বড় মেয়ে অঞ্জলি মাসি আম্মার খুব বন্ধু। অঞ্জনাদি মাসি ছোট খালার বান্ধবী, অঞ্জনাদি মাসির ডাক নাম ছিলো টেপি। কালো কিন্তু ভীষণ মিষ্টি।টেপি মাসিকে মাসি বলার আগে দি কেন বলতাম জানিনা। সে ছিলো অনেক চঞ্চল আর দুষ্টু, সারাক্ষণ বকবক করতো, বাসায় এসে কত যে গল্প করতো।আমার ছোট মামার সঙ্গে একটু ভাব ভালোবাসা হয়েছিলো বোধ হয়। মাসী আমাদের বাসায় এলে ছোট মামা দেখতাম চোরা চোখে তার দিকে তাকাতো। সেও মামার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসি দিতো হাসলে গালে টোল পরতো।তার বড় বোন অঞ্জলি মাসি ছিলো ঠিক তার উল্টো, সে স্কুল শিক্ষক ছিলো একদমই কথা বলতো না। বেশ বয়েস হয়ে গিয়েছিলো কিন্তু ভালো পাত্র পাওয়া যাচ্ছিলোনা বলে বিয়ে হচ্ছিলো না। এই জন্য সারাক্ষণ মন মরা থাকতো মাসী। আম্মার সঙ্গে অবশ্য পুটুর পুটুর করে কথা বলতো। দু’জনে মিলে সিনেমা দেখতে যেতো। একরকম শাড়ি কিনতো। পুজো আচ্চায় আমাদের জন্য খিচুড়ী নিরামিষ পাঠিয়ে দিতো মাসী। আমাদের বাসা থেকেও রোজার দিনে ইফতারি পাঠানো হতো। ঈদের সময় আমার নানী গরুর মাংস বাদে পোলাউ মুরগীর মাংস পাঠিয়ে দিতো। সেমাই গামলা ভরে তাদের বাসায় পাঠিয়ে দিতো। ঋষি নানা আর টেপি মাসি বাসায় এসে খেয়ে যেতো।তাদের পার্বণে আমি আর নানু তাদের বাসায় খেয়ে আসতাম! মাঝে মাঝে দুই বাসায় গানের আসর বসতো। আশপাশের বাসার মানুষজন চলে আসতো গান শুনতে, সেই আসরে আমিও গান গাইতাম আবৃত্তি করতাম। টেপিদি মাসি, ঋষি নানা, মিন্টু ,নান্টু আমরা সবাই মিলে, আসর জমিয়ে দিতাম।
ঋষি নানারা ব্রাক্ষ্মন ছিলেন। তাঁর দুই পুত্র সূর্য মামা আর ভানু মামা। সূর্য মামা ব্যাংকে চাকরি করতেন। হঠাৎ একদিন সূর্য মামা এক সাহা বংশের মেয়েকে পালিয়ে বিয়ে করলেন ।ঋষি নানাতো ঐ মেয়েকে কিছুতেই ঘরে উঠাবেন না,আবার একমাত্র উপার্জনক্ষম পূত্র, তাকে বের করে দিলে সংসার চলবে কি করে? মহা সমস্যা, ছোট ছেলে পড়াশোনা করছে। সে টিউশনি করে নিজের খরচ জোগায়। নানু ঋষি নানাকে বুঝালেন, ঋষি ,মানুষ তো নিজেই একটা জাতী তার আবার আলাদা জাত কি? মানুষ ছোট জাত হয় স্বভাবের কারণে, জন্মের কারণে না। তুমি বৈমারে নিয়া আসো। হাত কাটলে তোমারও লাল রক্ত বের হবে আমারও লাল রক্ত, মানুষে মানুষে ভাগ করে লাভ কি। এরপর পুরো পরিবারই বৌদি মাসিকে মেনে নিয়েছিলো। যতটা না নানুর অনুরোধে তার চাইতে বেশী রোজগারি ছেলেকে হারানোর ভয়ে। কারণ টেপিদি মাসির মা কোনোদিনই বৌদি মাসির হাতের রান্না খায়নি। তবে তাঁরা বহু বছর একসঙ্গে ছিলেন। কখনো অশান্তি হয়নি।অঞ্জলি মাসিরও বিয়ে হয়েছিলো। তার ছেলে মেয়েও আছে। আমার সঙ্গে বহুবছর হয় ওদের যোগাযোগ নেই।
আমার ছেলেবেলটা আমার সোনালী সময়। হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্টান পাশাপাশি থেকেছি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছিলো অপরিসীম। এখনও মানুষই আমাকে টানে।
মনের ভেতর বাস করেন আজীবন
শ্বেতা চট্টোপাধ্যায় (শিক্ষক ও লেখক)
হঠাৎ করেই ধূমকেতুর মতো এসে পড়া মানুষজন চিলতে আলো হয়ে দেখা দেন আমাদের জীবনে..। আগে থেকে তাকে সেভাবে চোখে না পড়লেও সেই মানুষগুলোর অদ্ভুৎ ঋণ ভোলা যায় না কোনোদিন । এমনই একজন প্রতিবেশীর কথা শুনেছিলাম পরিবার সূত্রে। নিজে তাকে চোখে না দেখলেও শুনেছিলাম তার বড় মনের কথা। ছোটবেলা থেকে নানাবিধ সংগ্রাম করে বড় হওয়া একটি ছেলে যখন খড়কুটোর মত নিজের সামান্য পৈতৃক মাটি টুকুতে মাথাগোঁজার মত একটা বাড়ি তৈরি করার চেষ্টা করছে, তখন সেই পরিবারেরই লোকজন বাঁধ সেধেছিল নানা ভাবে। এসব কথা শুনলেই আমার কাঁকড়ার কথা মনে পড়ে । কিছু মানুষ বরাবরই নিজের জীবনের হতাশা অন্যের মধ্যে বিলি করে আনন্দ পায় । এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি । ক্রমাগত পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে বাঁধা পেয়ে ছেলেটির ভিতর তখন জেদ, যেভাবেই হোক বাড়িটা দাঁড় করাতেই হবে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হল ছাদ ঢালাই এর সময় । কারণ, ছোট জমির আশেপাশে কোথাও ছাদ ঢালাইয়ের সামগ্রী রাখার জায়গা ছিলোনা। গাড়ি চলাচল, যাতায়াতের অসুবিধা করাও ছিলো শান্ত ছেলেটির নীতির বিরোধী । এমতাবস্থায় ত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভাব ঘটেছিলো সেই ব্যতিক্রমী প্রতিবেশি লোকটির । আদতে তার তেমন কোনও সম্বল ছিলোনা, তথাকথিত চাকরি, মোটা অর্থ কিছুই না। বৈবাহিক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে দিন অতিবাহিত হওয়া মানুষটি এগিয়ে এসে আশ্বাস দিয়ে বলেছিল, ‘আমার বাড়িতেই থাকুক এইসব জিনিস, তোমার বাড়িটা যেন নির্বিঘ্নে তৈরি হয়..।’ এমন সব মানুষদের জন্যই ঐ শব্দ সার্থক..। ‘বিত্ত হতে চিত্ত বড়..।’ কোনো কোনো প্রতিবেশি এমনই হন, যারা একটা সময়ের পর চোখের আড়ালে চলে গেলেও, মনের ভেতর বাস করেন আজীবন..।

অতীতের কিছু স্মৃতি আনন্দ দেয় আবার বেদনাকেও খুঁচিয়ে তাজা করে
রুখসানা আক্তার (লেখক)
অতীতের কিছু কিছু স্মৃতিচারণ একদিকে যেমন বেশ আনন্দ দেয় তেমনি অনেক স্মৃতি অতীতের বেদনাকে পুনরায় খুঁচিয়ে তাজাও করে দেয়।
আমার বেড়ে ওঠা বলা চলে শৈশব কেটেছে খুব সুন্দর একটা নির্মল ,নৈসর্গিক ,প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশে। সেখানে শহরের পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীন জীবন এবং সেই পরিবেশের সঙ্গে পিরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটেছিল আমার । আমার সেই দুরন্ত শৈশবের অনেক গল্প আছে।
শৈশবের কিছু সম্পর্ক , কিছু মানুষকে কখনোই আমি ভুলতে পারবো না। তার মধ্যে একজন ছিলেন লাইজু আপা (আসল নামটা ইচ্ছে করেই বলিনি)। আমাদের এক প্রতিবেশী। তারা এক ভাই এক বোন ছিলেন এবং ভাই ছিলেন বড় ।। আমি ছিলাম উনাদের ছোট বোনের মত।
সেই সময়টাতে আমার বোনদের মধ্যে সবচেয়ে যিনি কাছের ছিলেন সেই সেজ আপার বিয়ে হয়ে যায় এবং সদ্য ইংল্যান্ড প্রবাসী হয়েছেন তখন। ভীষণ মনকষ্টে ভুগছিলাম । কারো কাছে প্রকাশ করতেও পারছিলাম না আর সেই সঙ্গে আমি কৈশোর বেলার ডিফিকাল্ট সময়ও পার করছিলাম। লাইজু আপারা নতুন প্রতিবেশী হয়ে আমাদের পাড়ায় তাদের সদ্য নির্মিত বাসায় উঠেন প্রায় মাস ছয়েক হয় তখন। লাইজু আপা উচ্চতায় ছিলেন পাচঁ ফিট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা । ঘন কালো চুল হাটু পর্যন্ত এবং উজ্জ্বল গায়ের রং আর খুব সুন্দর স্কিন ছিলো উনার। তখন ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়তেন। উনার ভাই ও ছিলেন লম্বায় ছয় ফিট। উনি হবিগঞ্জের স্কাউট এবং কালচারাল এক্টিভিটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।
যা-ই হউক সেজ আপা ইংল্যান্ডে চলে যাওয়ার পর লাইজু আপা আমার ভিতরের মানসিক কষ্টটা বুঝতে পেরেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন যখনই বোনের কথা মনে পরবে আমার কাছে চলে এসো। একটা সময় এমন হলো যে আমার ঈদের জামা লাইজু আপা নিজে ডিজাইন দিয়ে উনার সেলাই মেশিনে বানিয়ে দিতেন। আমার লম্বা চুলে বেণী করে দেয়া থেকে শুরু করে বান্ধবীদের বাসায় বেড়াতে নিয়ে যাওয়া। এমনকি আমাকে প্রথম শাড়ি পরিয়ে স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে ছবি তুলেছিলেন। রবিবার দুপুরে বেলা খাওয়া দাওয়ার পর এক সঙ্গে লাইজু আপার বিছানায় বসে রেডিওতে সাপ্তাহিক নাটক শোনা, সিনেমা দেখতে যাওয়া , বিকেলে ঝাল মুড়ি খাওয়া সব ছিলো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার আমাদের দুজনের। আপা আমার সঙ্গে অনেক কিছু শেয়ার করতেন। উনার খুব সুন্দর ,ছিম ছাম একটা সংসারের স্বপ্ন ছিলো। সেই লাইজু আপার বিয়ে হলো। উনার বাবা রাজি ছিলেন না বিয়েতে কিন্তু উনার মায়ের দিকের আত্মীয়-স্বজনরা প্রচুর চাপ দিয়ে ধরে ইংল্যান্ড প্রবাসী খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে লাইজু আপার বিয়ে পড়িয়ে দেন মাত্র আঠারো বছর বয়সে। হাজবেন্ড উনার চাইতে দুই কি তিন বছরের বড় ছিলেন। এক সময় লাইজু আপা ও ইংল্যান্ড প্রবাসী হলেন আর আমিও আস্তে আস্তে নিজের পড়াশুনা ইত্যাদিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। অনেক অনেক বছর আর লাইজু আপা কে দেখিনি কারণ উনি দেশে আসেন নি। মাঝে একবার শুধু এসে ছিলেন উনার ছেলেকে নিয়ে অসুস্থ বাবাকে দেখতে তারপর আর আসেননি। উনার আব্বাও এদিকে মারা যান। আমিও ঢাকা চলে আসি পড়াশুনা করতে। হবিগঞ্জে গেলে উনার আম্মার কাছে মাঝে মাঝে জানতে চাই আপা কেমন আছেন।
তারপর একসময় আমিও ইংল্যান্ডে আসি। প্রায় আঠারো বছর পর লন্ডনে একদিন হোয়াইটচেপেল এলাকায় উনার ছোট ননদকে দেখতে পাই এবং আমি দৌড়ি গিয়ে তাকে ধরি এবং লাইজু আপার কথা জানতে চাই। ও কেমন যেন আমাকে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছিলো। আমি আমার ফোন নাম্বার দিয়ে অনুনয় করে বলেছিলাম যেন লাইজু আপা কে আমার নাম্বারটি দেয়। নাম্বারটা লাইজু আপার হাতে পৌছে। লাইজু আপা নাম্বার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন এবং উনার ইস্টহামের বাসার ঠিকানা দিয়ে যেতে বলেন। আমাকে বলেছিলেন অমুক বাস স্টপে নেমে আমাকে ফোন দিয়ো আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাবো। আরো বলেছিলেন তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে।
আমি বাস থেকে নেমে উনাকে ফোন দেই । প্রায় পনেরো মিনিট পর দেখি এক বোরকা পড়া মহিলা আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে আমাকে বলছেন তুমি তো অনেক বড় হয়ে গেছো ঝর্না। আমি এত বছর পর লাইজু আপাকে দেখে চমকে উঠি ,এ কাকে দেখছি আমি !যেন জীবন্মৃত এক নারী দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে। কালো বোরকা দিয়ে আপাদমস্তক ঢাকা। বোরকা মাথার পিছন দিকে সরে গিয়ে ভিতরের সেই ঘন কালো চুলের বদলে দু গাছি পাতলা এবং আধা পাকা সাদা চুল আলুথালু ভাবে মুখে এসে পরে ছিলো। উজ্জ্বল মাখনের মত ত্বক যেন মিলিয়ে নিষ্প্রভ। যেনো এক ঝরা ফুল আমার লাইজু আপা। আমায় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে আমাকে বুকে টেনে নেন তিনি। আমি সম্বিৎ ফিরে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করি কেমন আছেন লাইজু আপা। আপা ম্লান হাসি দিয়ে বলেন দেখে নিশ্চয় বুঝতে পারছো কেমন আছি। আমার কথা , হবিগঞ্জের কথা জিজ্ঞেস করতে করতে এক সময় উনার বাসায় ঢুকি। হল ওয়েতে জুতা খুলতে খুলতেই দেখি উনার হাজব্যান্ড উপর থেকে নিচে নেমে আসলেন। উনাকে দেখে আমার আবার আরেক দফা হতভম্ব হওয়ার পালা। কি স্মার্ট আর হ্যান্ডসাম ছিলেন অথচ এখন কি দেখছি। কোন রকমে সালাম দিলাম ।আমার সালামের জবাব দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন তারপর কিচেনে ঢুকে গেলেন।
প্রায় চার ঘণ্টা ছিলাম। অনেক কিছু রেঁধে ছিলেন আমার জন্য। উনার চার বাচ্চা। বড় ছেলে কলেজে পড়ে আর মেয়ে দুটু স্কুলে সেকেন্ডারিতে আর সবার ছোট বাচ্চার বয়স চার। লাইজু আপার সিটিং রুমে বসে গল্প করছিলাম । না লাইজু আপা কিছুই লুকান নি। হাজব্যান্ড এক সময় নাকি ব্যবসায় প্রচুর লস দিয়ে পুরাই উলটা পাল্টা জীবন শুরু করেন। এলকোহলিক হয়ে যান। সংসারের দিকে কোন মনোযোগ ছিলোনা। লাইজু আপাকে মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন ও সইতে হতো। তার মধ্যে লাইজু আপা কাজ করতেন তারপর সংসার দেখা ,বাচ্চা লালন পালন সে এক যুদ্ধ। বললেন এখন বাচ্চারা একটু বড় হওয়ায় কিছুটা নির্যাতন কমেছে কিন্তু এখনও বর এলকোহলিক এবং এক বছর ধরে দু’জন দুজ’নের সঙ্গে কথা বলেন না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম দেশে যান না কেন। সেই যে বড় ছেলে কে নিয়ে গিয়েছিলেন আর তো গেলেন না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, এই অবস্থা পরিবারকে দেখাতে চাইনি বলে আর যাওয়া হয় নি। বিদায় বেলা বলে ছিলেন যোগাযোগ রাখবো। এরপর আমার বাসায় একদিন বাচ্চাদের নিয়ে এসেছিলেন। তারপর আর যোগাযোগ নেই। অনেক ফোন করেছি কিন্তু ফোন যায় না। এদিকে একে একে উনার মা, আর এক মাত্র ভাইও গত হয়েছেন। আমিও ইমিগ্রেশনের বেড়াজালে এত ব্যস্ত ছিলাম যে আর যেতে পারিনি। কয়েক বছর আগে উনার ছোট ননদের সঙ্গে আবার দেখা। জিজ্ঞেস করেছিলাম লাইজু আপা কেমন আছেন? ননদ জানালো প্রায় বছর আট হলো লাইজু আপা উনার স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে আলাদা হয়ে অন্য জায়গায় মুভ করেছেন আর উনার স্বামী এখন প্রচন্ড অসুস্থ এবং বেশির ভাগ সময়ই বাংলাদেশেই কাটান । এরমধ্যে ভদ্রলোক নাকি দেশে একটা বিয়ে ও করেছিলেন। লাইজু আপার ফোন নাম্বার চাইলে ননদ বললো ,উনি অনেক আগেই নাম্বার বদলিয়েছেন এবং নতুন নাম্বার জানা নেই কারণ কারো সঙ্গেই লাইজু আপা আর যোগাযোগ রাখেননা ।
ছবি: প্রাণের বাংলা



শেষ শীতের গল্প...
5 Feb 2026
1790 বার পড়া হয়েছে

মিসেস সেনের গল্প…
22 Jan 2026
1630 বার পড়া হয়েছে

প্রিয় সেই প্রতিবেশীরা…
15 Jan 2026
1815 বার পড়া হয়েছে

...
1 Jan 2026
2545 বার পড়া হয়েছে

সত্যজিতের ক্লিক আর পিকাসো
18 Dec 2025
1170 বার পড়া হয়েছে

কয়েক স্লিপ শীত
18 Dec 2025
1290 বার পড়া হয়েছে

রাগের আগুন
4 Dec 2025
1115 বার পড়া হয়েছে

ইতিহাস লেখকের দায়
20 Nov 2025
1480 বার পড়া হয়েছে

বাঙালির ছিদ্রান্বেষণ
13 Nov 2025
1375 বার পড়া হয়েছে

রোদে লেপ বলে, শীত…
6 Nov 2025
2565 বার পড়া হয়েছে

গোপন গল্প...
30 Oct 2025
2215 বার পড়া হয়েছে

কিছু মায়া রয়ে গেল…
16 Oct 2025
1880 বার পড়া হয়েছে

শীত চায়…
2 Oct 2025
1450 বার পড়া হয়েছে

লিখছি তোমাকে শরৎকাল...
26 Sept 2025
2920 বার পড়া হয়েছে

আমি ঝড়ের কাছে…
18 Sept 2025
4545 বার পড়া হয়েছে

ইঁদুর, ইঁদুর…
30 Jan 2025
8090 বার পড়া হয়েছে

হাঁটতে হাঁটতে…
23 Jan 2025
6485 বার পড়া হয়েছে

এই গিটারটা বন্দুক হয়ে যেতে পারে...
16 Jan 2025
6975 বার পড়া হয়েছে

পুরুষ নেই...
9 Jan 2025
6180 বার পড়া হয়েছে

শীতকাল ভালোবেসে…
2 Jan 2025
5315 বার পড়া হয়েছে

এত লোক জীবনের বলী…
19 Dec 2024
5040 বার পড়া হয়েছে

চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস…
12 Dec 2024
3205 বার পড়া হয়েছে

জয়া’র জয়
5 Dec 2024
4235 বার পড়া হয়েছে

দু‘শ সেকেন্ডের সেই টেলিফোন কল
28 Nov 2024
4370 বার পড়া হয়েছে

কাফকার আঁকাজোঁকা
21 Nov 2024
3395 বার পড়া হয়েছে

স্বৈরাচার স্বৈরাচার…
14 Nov 2024
8370 বার পড়া হয়েছে

ডার্ক ট্যুরিজম
7 Nov 2024
8470 বার পড়া হয়েছে

ফেরা…
31 Oct 2024
3915 বার পড়া হয়েছে

অনুজ্জ্বল বিষের পাত্র
24 Oct 2024
3610 বার পড়া হয়েছে

ঋত্বিকের সুচিত্রা সেন
17 Oct 2024
2815 বার পড়া হয়েছে

হেমন্তের অরণ্যে পোস্টম্যান
10 Oct 2024
3920 বার পড়া হয়েছে

গোয়েন্দা কাহিনি এখন…
1 Oct 2024
3190 বার পড়া হয়েছে

ঝড়ের কেন্দ্র
19 Sept 2024
3040 বার পড়া হয়েছে

তখন হাসপাতালে…
11 Jul 2024
5225 বার পড়া হয়েছে

ছাতার মাথা ...
4 Jul 2024
6415 বার পড়া হয়েছে

আমি, তুমি ও ম্যাকবেথ…
27 Jun 2024
4505 বার পড়া হয়েছে

কফির কাপে ঝড়…
13 Jun 2024
3505 বার পড়া হয়েছে

চশমার কাচে সমুদ্র
6 Jun 2024
3160 বার পড়া হয়েছে

মেরিলিন মনরো আর রুবি রায়
30 May 2024
4035 বার পড়া হয়েছে

খুন জখমের গল্পে নারীরা...
9 May 2024
3565 বার পড়া হয়েছে

পথের মানুষ…
3 May 2024
3605 বার পড়া হয়েছে

দহন
25 Apr 2024
4295 বার পড়া হয়েছে

আয়না অনেক গল্প জানে…
10 Apr 2024
6075 বার পড়া হয়েছে

গোলাপের নিচে...
28 Mar 2024
5875 বার পড়া হয়েছে

মুখে তার...
21 Mar 2024
3070 বার পড়া হয়েছে

লেনিনের যতো ভালোবাসার চিঠি…
14 Mar 2024
4235 বার পড়া হয়েছে

আমাদের ছুটি ছুটি ছুটি...
29 Feb 2024
6285 বার পড়া হয়েছে

যদি নির্বাসন দাও
22 Feb 2024
3880 বার পড়া হয়েছে

শীত চলে গেছে পরশু...
8 Feb 2024
3995 বার পড়া হয়েছে

মনে পড়লো তোমাকে বইমেলা...
1 Feb 2024
4445 বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব নির্জন বারান্দায়...
25 Jan 2024
3610 বার পড়া হয়েছে

ঋত্ত্বিক ঘটকের বউ…
11 Jan 2024
4195 বার পড়া হয়েছে

সুচিত্রা সেনের সানগ্লাস
4 Jan 2024
6145 বার পড়া হয়েছে

স্মৃতি পিপীলিকা…
28 Dec 2023
5295 বার পড়া হয়েছে

হাতে বোনা সোয়েটার আর…
21 Dec 2023
7310 বার পড়া হয়েছে

দেয়ালে উঠছে, দেয়াল ভাঙছে
13 Dec 2023
6305 বার পড়া হয়েছে

শীত এক মায়া
7 Dec 2023
6280 বার পড়া হয়েছে

উঁকি...
30 Nov 2023
4500 বার পড়া হয়েছে

দেশলাই জ্বালতেই…
23 Nov 2023
12215 বার পড়া হয়েছে

তোমার ও আঁখির তারায়...
9 Nov 2023
5940 বার পড়া হয়েছে

পাগল ...
26 Oct 2023
5810 বার পড়া হয়েছে

শীতের খোঁজে...
19 Oct 2023
6485 বার পড়া হয়েছে

বৃষ্টিতে থাকলো নির্জন সাইকেল...
5 Oct 2023
7135 বার পড়া হয়েছে

নারী ভয়ংকর
28 Sept 2023
10640 বার পড়া হয়েছে

তবুও সন্ধ্যা আসে…
14 Sept 2023
7730 বার পড়া হয়েছে

হিটলারের নেশা
7 Sept 2023
10755 বার পড়া হয়েছে

ক্লাপারবোর্ড
31 Aug 2023
13595 বার পড়া হয়েছে

মোনালিসার গোয়েন্দারা
23 Aug 2023
3765 বার পড়া হয়েছে
.png )
খেলা যখন…
15 Jun 2023
3650 বার পড়া হয়েছে

ইতি, চায়ের দোকান...
1 Jun 2023
9220 বার পড়া হয়েছে
(1).png )
লেখকদের ঘরবাড়ি
10 May 2023
3740 বার পড়া হয়েছে

মেয়েরা প্রেমের চিঠি লেখে না
20 Apr 2023
8570 বার পড়া হয়েছে

বৈশাখে আঞ্চলিক খাবার..
13 Apr 2023
3125 বার পড়া হয়েছে

স্ট্রিট ফাইটিং ইয়ার্স...
6 Mar 2023
3115 বার পড়া হয়েছে

হাওয়ায় লেগেছে শরতের গন্ধ।
4 Jan 2023
3490 বার পড়া হয়েছে

রাজনৈতিক ফুটবল
4 Jan 2023
4055 বার পড়া হয়েছে

হাসপাতাল থেকে…
23 Jun 2022
2865 বার পড়া হয়েছে

একলা মাদুর…
16 Jun 2022
2400 বার পড়া হয়েছে

পালাতে হয়েছিলো মোনালিসাকে
7 Jan 2021
3645 বার পড়া হয়েছে

হেমন্তের অরণ্যে পোস্টম্যান
29 Oct 2020
3835 বার পড়া হয়েছে

গডফাদার ৫২ বছরে
22 Oct 2020
3020 বার পড়া হয়েছে

দানব অথবা দানবীয়...
8 Oct 2020
2990 বার পড়া হয়েছে

দুই শীতের মাঝখানে
1 Oct 2020
3020 বার পড়া হয়েছে

আরেক বিভূতিভূষণ...
17 Sept 2020
2370 বার পড়া হয়েছে

আয়নায় একা উত্তম...
3 Sept 2020
2540 বার পড়া হয়েছে

দ্বিতীয় পথের পাঁচালী
27 Aug 2020
3380 বার পড়া হয়েছে

ভালো না-বাসার কাল
13 Aug 2020
2380 বার পড়া হয়েছে

যতদূর থাকো ফের দেখা হবে
5 Aug 2020
2560 বার পড়া হয়েছে

বিপজ্জনক মানিক
2 Jul 2020
2570 বার পড়া হয়েছে

নিখোঁজ হয়েছিলেন আগাথা ক্রিস্টিও
23 May 2020
2255 বার পড়া হয়েছে

আমাকে মনে পড়ে?
14 Apr 2020
2255 বার পড়া হয়েছে

আমি ইতালী থেকে লিখছি...
29 Mar 2020
2345 বার পড়া হয়েছে

পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন...
12 Mar 2020
3055 বার পড়া হয়েছে

মুখোমুখি বসিবার...
27 Feb 2020
2460 বার পড়া হয়েছে

শীতে ভালোবাসার পদ্ধতি
6 Feb 2020
5490 বার পড়া হয়েছে

হিব্রু ভাষায় কাফকার চিঠি
30 Jan 2020
2520 বার পড়া হয়েছে

ইভা ব্রাউনের অন্তরাল
23 Jan 2020
3190 বার পড়া হয়েছে

শীতের স্মৃতি
9 Jan 2020
2680 বার পড়া হয়েছে

কেক কুকিজের গন্ধে ...
24 Dec 2019
2775 বার পড়া হয়েছে

জুতার ভেতরে...
19 Dec 2019
2235 বার পড়া হয়েছে

খুন হয়েছিলেন আলবেয়ার কামু
12 Dec 2019
3325 বার পড়া হয়েছে

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাকরিবাকরি
5 Dec 2019
2425 বার পড়া হয়েছে

পৃথিবী বিখ্যাত পোস্টার যত
28 Nov 2019
3675 বার পড়া হয়েছে

পেঁয়াজের পিঁয়াজী
21 Nov 2019
2655 বার পড়া হয়েছে

সিনেমায় দু’চাকার ঝড়
14 Nov 2019
1975 বার পড়া হয়েছে

শেষদৃশ্যে জুলিয়াস ফুচিক
7 Nov 2019
3265 বার পড়া হয়েছে

অভিমানে কি দেশ ছাড়বেন সাকিব
31 Oct 2019
2245 বার পড়া হয়েছে

ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবেরা
17 Oct 2019
4005 বার পড়া হয়েছে

স্বপ্ন, দু:স্বপ্নের পুরুষ
10 Oct 2019
2130 বার পড়া হয়েছে

স্মৃতির রুমালে শিউলি...
3 Oct 2019
7640 বার পড়া হয়েছে

নির্ঘুম শহরে...
26 Sept 2019
2575 বার পড়া হয়েছে

ধূসর পাণ্ডলিপি
19 Sept 2019
2445 বার পড়া হয়েছে

এক্সপোজড...
12 Sept 2019
2565 বার পড়া হয়েছে

নারী ও শাড়ি ...
5 Sept 2019
3350 বার পড়া হয়েছে

পথের পাঁচালী’র ৬৪
29 Aug 2019
2555 বার পড়া হয়েছে

প্রেম আর যৌনতায় তারা
22 Aug 2019
2435 বার পড়া হয়েছে

যৌনতায়, বিদ্রোহে তাঁরা...
1 Aug 2019
2590 বার পড়া হয়েছে

খুনের সময়ে...
25 Jul 2019
2665 বার পড়া হয়েছে

পথ...
11 Jul 2019
2195 বার পড়া হয়েছে

যে কোন দলই ছিটকে পড়তে পারে
27 Jun 2019
2650 বার পড়া হয়েছে

বৃষ্টিকাল কবে আসবে নন্দিনী
20 Jun 2019
3355 বার পড়া হয়েছে

স্নানঘরের গান...
2 Jun 2019
2540 বার পড়া হয়েছে

আমার কোনো ভয় নেই তো...
23 May 2019
2445 বার পড়া হয়েছে

রেখার ফারজানা...
2 May 2019
2360 বার পড়া হয়েছে

হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী
25 Apr 2019
4700 বার পড়া হয়েছে

নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে...
18 Apr 2019
2360 বার পড়া হয়েছে

আপুদের পথের ভাই ...
4 Apr 2019
2810 বার পড়া হয়েছে

আমাদের প্রাণের বাংলা
28 Mar 2019
2710 বার পড়া হয়েছে

ক্যানভাসে ঝরে পড়া অসুখ
21 Mar 2019
2225 বার পড়া হয়েছে

শেষদৃশ্যে লোরকা
14 Mar 2019
2635 বার পড়া হয়েছে

নেশার ঘোরে লেখক
7 Mar 2019
4385 বার পড়া হয়েছে

একটি বইয়ের গল্পের সঙ্গে...
1 Mar 2019
2820 বার পড়া হয়েছে

বই করেছি চুরি...
21 Feb 2019
5475 বার পড়া হয়েছে

সকালবেলার গুলজার
7 Feb 2019
2685 বার পড়া হয়েছে

বইমেলায় প্রেম...
31 Jan 2019
2180 বার পড়া হয়েছে

অ্যান্ড এ স্পাই...
24 Jan 2019
3015 বার পড়া হয়েছে

আপনার সন্তান কি নিরাপদ
10 Jan 2019
2085 বার পড়া হয়েছে

পুষ্পহীন যাত্রাশেষে মৃণাল সেন
3 Jan 2019
2395 বার পড়া হয়েছে

নিষিদ্ধ যতো বই আর সিনেমা
13 Dec 2018
4235 বার পড়া হয়েছে

অসুখী মানুষ
6 Dec 2018
2545 বার পড়া হয়েছে

দাম্পত্য সম্পর্কে #MeToo
29 Nov 2018
2905 বার পড়া হয়েছে

দুই নম্বরি...
22 Nov 2018
2840 বার পড়া হয়েছে

অশ্লীল গল্প
8 Nov 2018
10920 বার পড়া হয়েছে

ফুলগুলো সরিয়ে নাও, আমার লাগছে
1 Nov 2018
4660 বার পড়া হয়েছে

লাভ রানস ব্লাইন্ড
25 Oct 2018
2705 বার পড়া হয়েছে

শেষ দৃশ্যে মান্টো
18 Oct 2018
2800 বার পড়া হয়েছে

আমাদের সেই বারান্দায়...
11 Oct 2018
2330 বার পড়া হয়েছে

শীতকাল কবে আসবে সুপর্না?
4 Oct 2018
3275 বার পড়া হয়েছে

কোমায় আমাদের সিনেমা
20 Sept 2018
2335 বার পড়া হয়েছে

আজো বিভূতিভূষণ...
13 Sept 2018
2435 বার পড়া হয়েছে

ভীষণ অচেনা ও একা...
6 Sept 2018
2325 বার পড়া হয়েছে

গোপন কথা...
9 Aug 2018
2470 বার পড়া হয়েছে

খোলা চিঠি ও চুমু
26 Jul 2018
3450 বার পড়া হয়েছে

ফ্রিডা কাহলো এক সূর্যমুখী ফুল
19 Jul 2018
2370 বার পড়া হয়েছে

ঝিনুক নীরবে সহো...
5 Jul 2018
2600 বার পড়া হয়েছে

ফুটবল- রঙ্গ ভরা বঙ্গে
28 Jun 2018
2210 বার পড়া হয়েছে

জানালা কী জানালো...
11 Jun 2018
5080 বার পড়া হয়েছে

বিষয় বাসনা
19 Apr 2018
3350 বার পড়া হয়েছে

মনের রঙ...
15 Feb 2018
2525 বার পড়া হয়েছে

দাড়ি কান্ড...
18 Jan 2018
3800 বার পড়া হয়েছে
স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।
Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]
Phone: +8801818189677, +8801717256199