টুকরো টুকরো জমানো দৃশ্য... ২

আবিদা নাসরীন কলি

সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 15 Sept 2022

3210 বার পড়া হয়েছে

Shoes

বেড়াতে গেলে টুকরো টুকরো অনেক দৃশ্য জমা হয় মনের কুঠরিতে।সেখানে নিত্য সুগন্ধি বাতাস যাওয়া আসা করে।আর ঠিক যেনো আমরা রূপকথার সোনার কাঠি ছুইঁয়ে দিয়েই মনের মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে রেখে দেই।  অবসরে মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করি।কখনও সে অলিন্দে ঢেউ উঠলে, বাতাস নেচে ফিরলে দৃশ্যগুলো চোখের সামনে আসে।খুলে যায় মনের দরজার আগল। আর এভাবেই শুরু হয়ে যায় আমাদের গল্প বলা…।আমার ঘুরে আসা হিউস্টন,নিউ অর্লিয়েন্স আর মিসিসিপির ছোট্ট শহর বিলক্সির চেনা রাস্তা।অচেনা মানুষ।পাখির গান। ফুলের গন্ধ। লাইট হাউস। সমুদ্রের পাড়ে হারিয়ে যাওয়া। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি, মেঘ।নাম নাজানা কত ফুল।মাথার উপর ঢেকে থাকা আকাশ আর আমার ছোট্ট বন্ধু মালালাকে  নিয়েই আমার এলোমেলো মনে যা আসে তা-ই এখানে আপনাদের জন্য …প্রাণের বাংলায় থাকলো…

দুই.

এবার ডমেস্টিক ফ্লাইট ধরার পালা।এই প্লেনগুলোর দৈর্ঘ্য আর প্রস্থের স্বল্পতায় আমাদের দেশের অনেকেই ভীত। কেমন দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়।যেনো গায়ে গা ঠেকে। আমার পরিচিত অনেকেই দম জমাট করা এই আবহ্ থেকে রেহাই পেতে অনেক দূরের পথও বাসে পাড়ি জমান।কেউবা স্ব-বাহনে হরেক শহর দেখে দেখে গন্তব্যে পৌছান।ছোটবেলা থেকেই আমার স্বল্প পরিসরে ভয়।লুকোচুরি খেলা তাই কখনও হয়ে উঠেনি।খাটের নিচে লুকাবো!কোনো কিছুর আড়ালে আটোসাটো হয়ে বসবো! সে কম্মটি আমাকে দিয়ে হয়নি কখনও। ওই যে একটাই ভয়-গলাটা কে যেনো চেপে ধরে। শীতেও ঘেমে নেয়ে উঠি। 

ইউনাইটেড এয়াওয়েজের প্লেন। ভেতরে পা রেখেই গন্তব্যের দুরত্ব মাপি । ভয়ে মন জড়োসড়ো।প্লেন একটু একটু করে ডানা মেলছে আর আমার চিবুকে ঘাম জমছে। যাত্রী ষোল-সতেরো জন।সবাই বেশ রিলাক্স মুডে।অনেকে বসেই হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো।

পুরোটা সমুদ্রের উপর দিয়ে এ যাত্রা। ততোক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে ।একবার নিচের দিকে তাকাই…আলোর ফুলঝুরিতে  ভরে আছে হিউস্টন শহর ।  মনে মনে সাহসী হতে চেষ্টা করি।ভয় পালাতে আসছে স্মৃতিরা। ভাবি স্বপ্ন নয়, স্বপ্নের চেয়েও বড়ো কিছু পাবো আমি ক্ষনকাল পরেই…সে আমার মালালা!  তার চেয়ে আমার বয়স ঢের বেশি হলেও  সে আমর বন্ধু মালালা, যে মালালা- বসে উপুর হয়ে খাতা ভরে ছবি আঁকতো।বিকেল হলে ছাদ- বাগানে বেড়াতে যেতো। ফুলের সঙ্গে কথা বলতো।গন্ধ নিতো।কখনও কুটুস করে ফুলটা ছিঁড়ে আমার চুলে গুজে দিতো।ম্যাট বিছিয়ে ইয়োগা করতো। গান ছেড়ে নাচ করতো।বাথটাব থেকে উঠে গায়ে পানি নিয়ে বেমক্কা  আমাকে জড়িয়ে ধরতো।সন্ধ্যে হলে খামখেয়ালী আলোতে আমার সঙ্গে লাইট পাসিং খেলতো। এ খেলাটা একেবারেই আমাদের সেলফি একটা  খেলা।নিজেরাই বানিয়েছিলাম। এমন হাজারো বায়ানাক্কা তার আমার সঙ্গে…।

মাঝে দু’বছরের অদেখা। অনেক অভ্যাস বদল।দৃষ্টি বদল।বিকেল-সন্ধ্যা বদল।প্রকৃতি বদল। এত বদলেও নিয়ম মেনে প্রতিদিন আমার সকাল হেসেছে মালালার ডাকে…দু‘জন মুঠোফোনের দু’প্রান্তে।আবারও পান্তাবুড়ি,কোয়াসিমোদো,মাটিলডা নিয়ে আমাদের শতকথা অফুরান থেকে যেতো।যা দূরের তাকে পাওয়া মানে সামান্য চোখের দেখাটুকুই…অনেক জিজ্ঞাসা তার কাছে আমার-‘আমায় সামনে দেখতে পেলে কি করবে?’ওর উত্তর‘ জড়িয়ে ধরে হাগ করবো।’তারপর তার কিছু করার লিস্টটা অনেক বড়ো হয়। হরেক ইচ্ছের হয়।

এর মধ্যে সোয়া ঘন্টা পেড়িয়ে গেছে। প্লেন এবার গাল্ফপোর্ট-বিলক্সি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের টারমাক ছুঁলো। ছোট্ট ছিমছাম এয়ারপোর্ট। নেই কোনো আলোর ঝলকানি। বড়োই বিমর্ষ। বড়োই বিষন্ন। সম্ভবত আমরাই শেষ ফ্লাইটের যাত্রী।কাছেপিঠে কোনো লোকজনের দেখা নেই।কনভেয়ার বেল্ট থেকে লাগেজ ধরতেই পাশে সৌধ (ভাইয়ের ছেলে) এসে দাঁড়ালো।সঙ্গে ওর মা। এবার আমি এক্কেবারে ফ্রি।চোখ ফিরছে মালালার খেঁজে।ওরা বললো এসেছে তো! আমার অপেক্ষা শেষ হলোএয়ারপোর্টে গেটে এসে। চোখ যায় মালালার দিকে। গাড়ির ভেতর চুপচাপ বসে। আমাকে দেখেই দরজা খুলে নেমে পড়ে। যেনো আমারই অপেক্ষায় সময় গুনছে। আমি একটু থমকে পড়ি! মনে হয় আসলেই দু’বছর অনেকটা সময়! মাথায় অনেকটা বেড়ে গেছে মালালা। দাঁত পড়ে যেনো ফোকলা বুড়ি। কাছে এগুলেই আমি সরে পড়ি- `আর এসোনা মা।‘ কভিডের কথাটা তখনই মনে এলো। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। এবার ভাবনা হলো।হাগ করা স্থগিতই রেখে দিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে মেয়েটা।ফোকলা দাঁতে বেশ লাগছে। আমি হাতটা সেনিটাইজ করে ওর দিকে হাত বাড়ালাম।এবার ছোট ছোট হাতগুলো আমার হাতের মুঠোতে।কি অদ্ভুত এক মায়া।জীবনে এমন কতকিছুই জমানো থাকে।

গাড়িতে উঠে দূরত্ব মেপেই বসলাম।মুহুর্তেই সব ক্লান্তি টা টা করলো। একটু একটু করে মালালার গায়ের গন্ধ আমার নাকে এসে ঝাপটা দিচ্ছে।আসলে কেউ কাউকে ভালোবাসলে গা থেকে এমন গন্ধ বেরোয়।একেবারে তার নিজেস্ব গন্ধ।

গাড়িতে আমরা চারজন। মালালার’মা ড্রাইভ করছে সৌধ তার পাশে। আমি আর মালালা পেছনের আসন দখল করে। গাড়ি রাস্তার বাক বদল করে। এবার আমরা বিলক্সির পথে এগোই। মালালা আমাকে সেই পথ চলতে চলতে পথের চারপাশ চেনাতে লাগলো।রাত সাড়ে ন’টাতেই মনে হলো সমস্ত শহর ঘুমের ঘোরে।পথে তখন শুধু আমাদের গাড়িটাই।

ছবিঃ প্রাণের বাংলা

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199