তাহলে শুরু করা যাক গল্প…১৪

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 23 Jul 2020

2190 বার পড়া হয়েছে

Shoes
অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

আজ যেন খুশির অন্ত নেই। সারা বাড়ি গমগম করছে মানুষের কোলাহলে। আত্মীয় কুটুম্ব ছেলেবুড়ো সব মিলে আজ যেন ডানা মেলে উড়ছে এ বাড়ির কুলুঙ্গি চৌকাঠ থেকে চিলেকোঠার ছাদ। মৃণালের আজ বাপু ফুরসৎ নেই তোমাদের সঙ্গে গপ্পো করার। সে বলে কাজ করে কুল পাচ্ছে না! একবার এদিক থেকে এ ডাকে তো আরেকবার ওদিক থেকে সে ডাকে। ননদ ননদাই ভাইপো ভাইঝি মিলে এ বাড়িতে আজ সরগরম বর্ষা। এরম দিনে কাজ করতে ভারী ভালো লাগে মৃণালের। হাতে হাতে কাজ করো আর গল্প করো, কেমন সুখ বলতো! কাজের ভিতরে মানুষের এই যে কেমন আকাশের আলো গাছের খুশি মিলেমিশে থাকে এ ভারী চমৎকার। শ্রাবণের বিষাদ ধুয়ে যায় তখন কলহাস্যের দমকে দমকে। উঠোন পেরোতে পেরোতে মৃণালের আজ স্থির হয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে কিছুক্ষণ। জলের গুড়ো গুড়ো দানা ভিজিয়ে দেয় ওর শাড়ি মাথা সমস্ত কিছু। নিয়মের বাইরে গিয়ে এরকম একেকটা দিনে ওর বেখেয়ালে চলতে ইচ্ছে করে আপাদমস্তক। বড় কানা উঁচু পাত্রে সেদিন ও খিচুড়ি রান্না করে বেশ জুত করে। সোনামুগের ডাল ভাজে যত্ন করে। সে ডালে রঙ ধরে, গন্ধ ছড়ায়। আতপ চালে ডালে আনাজপাতি দিয়ে টগবগিয়ে ফোটে খিচুড়ি। নামানোর আগে আলগা হাতে গাওয়া ঘি ছড়িয়ে দেয় ও। মেজ ননদ ওদিকে এবার ইলিশ ভাজবে, চাকা চাকা আলু ভাজবে, পটল ভাজবে। নিরামিষ হেঁশেলের জন্য যত্ন করে তুলে রাখা আছে ফুলবড়ি কিছু। খিচুড়ির জুড়িদারেরা এমন দুপুরে কলাপাতা পেতে বসে পড়বে টপাটপ। গরম খিচুড়ি ঢেলে দিলেই কলাপাতার গন্ধ মিশে যাবে তাতে। ইলিশের ডিম ভাজা খেতে মৃণালের যে কী ভালোলাগে! তবু, সক্কলকে দিয়ে শেষ অবধি আর খাওয়া হয়ে ওঠে না আজকাল। তবু স্বাদের স্মৃতি কেমন অটুট হয়ে থেকে যায় তার সবটুকু ইন্দ্রিয় সচেতনতা নিয়ে!
এসব ভাবলে একেকদিন আবার কৈশোরের দিনগুলোয় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে ওর। কিন্তু আজ যেন , আক্ষেপের কোনো সামান্য স্পর্শটুকুও ওকে আর ছুঁতে পারছে না। আজ ইলিশের ডিমভাজা দিতে দিতে ফুরিয়ে যাচ্ছে জেনেও মৃণালের ভারী ভালোলাগছে। ওর মনে হচ্ছে সংসারের এই সাধনপথে মানুষের কত সামান্য ত্যাগও তার শ্রাবণ দুপুরের খুশি হয়ে ঢেকে ফেলতে পারে আকাশকে। ওর মনে পড়ে জ্যাঠামশাইয়ের কথা। এমন বর্ষায় তিনি তার কোষা নৌকাখানি নিয়ে সেই কোন দূর থেকে মাছ নিয়ে আসতেন। থেলো হুঁকোয় টান দিতে দিতে ভারী উদাসীন ভঙ্গিতে মৃণালের খাবার থালাটির পাশে বসতেন। স্নেহ যেন এই শ্রাবণ দিনের দুপুরের মতো মানুষকে ছায়া দেয় গুড়ো গুড়ো বৃষ্টিতে ভেজায় আর অনেক দিনের ফেলে আসা সুখস্মৃতির ভিড়ে আবার হারিয়ে যেতে সাহায্য করে। আসলেই একেকটা ঋতুর মধ্যে মিলেমিশে থাকে কত সব স্থায়ী আর সঞ্চারী রস। মেঘেদের মতো এমন সঞ্চরমান যে মানবমনের গহীন জটিল চিদাকাশ সেখানে স্নেহ আর অভিমান পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেষি করে থাকে। সেখানে অভিমানের মধ্যেও মিশে থাকে কতশত আত্মরতি। মৃণাল তাই খিচুড়ির পাশে সযত্ন বেড়ে দেয় ইলিশের ডিম, পটল ভাজা, আনারসের চাটনি। আহা! মেঘের ছায়া মাখতে মাখতে কলাপাতার গা বেয়ে আনারসের চাটনি কেমন গড়িয়ে চলেছ দেখ! জীবনের গড়িয়ে পড়া বাড়তি কিছু আবেগ কিছু খুশি আছে বলেই না একেকটা শ্রাবণ দিন তার সবটুকু ঐশ্বর্য নিয়ে জীবনের চৌকাঠে এসে দাঁড়ায়! সেদিন চৌকাঠ জুড়ে অনন্ত বর্ষা নামে, গোড়ালি ডবানো কাদায় দাঁড়িয়ে ধান রুয়ে দিতে দিতে ঝাপসা হয়ে যায় চারিদিক। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো মানুষেরা তখন নিজের মধ্যে ডুবে যায় খেয়ালে বেখেয়ালে। কত ক্ষোভ গ্লানি বিবাদ বিসম্বাদ মিলেমিশে থাকে এই হেঁশেলের হাঁড়িপাতিলে। আজ যেন সেসব চুকেবুকে গেছে। অনন্ত অভিমানের ওপারে জীবনের যে মায়াটুকু লেগে থাকে! তা ইলিশের ডিম, ফুলবড়ি ভাজা বা সোনামুগের খিচুড়ির চেয়েও বেশি প্রিয়। মৃণাল তাই নিজের জন্য খিচুড়ি বেড়ে নিতে নিতে হারিয়ে যাচ্ছে মেঘেদের অরণ্যে, প্রগাঢ় বৃষ্টিচ্ছায়ায়। (চলবে)
ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199