মন খারাপের সঙ্গে আড়ি…

আবিদা নাসরীন কলি

সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 20 Nov 2025

1965 বার পড়া হয়েছে

Shoes

‘পাগল রাগ করে চলে যাবে,খুঁজেও পাবেনা

পাগল কষ্ট চেপে চলে যাবে, ফিরেও আসবেনা।’

সঞ্জীব চৌধুরী

সত্যি সত্যিই কি পাগল অভিমান নিয়ে চলে গেলো… ভাবলে মন খারাপ হয়।আসলেই কি আমরা মানুষটাকে বুঝতে পারিনি!! যেনো আকাশ জুড়ে মনকেমনের বাঁশি।আমরা হয়তো এখন বছর পেরিয়ে পেরিয়ে অনেক কিছুই ভুলতে বসেছি। তবে ভুলে যাওয়া মেঘলা ছাতাও কখনো খুলে বসে।

সঞ্জীব চৌধুরীকে আমি দাদা ডাকলেও নিয়মের কোনো তোয়াক্কা না করে, অঘোষিত আইন করে আমাকে মা ডাকতেন আর চলচ্চিত্র নির্মাতা শবনম ফেরদৌসিকে ডাকতেন খালাম্মা।প্রথম প্রথম হাসি পেলেও পরে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি।মিডিয়ামুল্লুকের সবারই এটা জানা ছিলো।

আমি আর দাদা এক মফস্বল শহরের বাসিন্দা হলেও আমাদের দেখা হয় ঢাকায়।৮৮সালের বন্যার সময় আমি ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হয়ে চাঁদা তুলি।সেরকম সময়ই একদিন টিএসসিতে দাদার সঙ্গে পরিচয়।আরও জানলাম উনি আমার ভাইয়ে বন্ধু। আর আমাদের দু’জনেরই উঠে আসা ছোট্ট মফস্বল শহর হবিগঞ্জ থেকে…আর যায় কোথায় সেদিন থেকেই আমরা হয়ে গেলাম আত্মার আত্মীয়।বিকেল-শেষের টুকরো রোদ্দুর ছুঁয়ে আমরা টিএসসিতে অনেক কাপ চা শেষ করেছি।আড্ডা দিয়েছি। সে আড্ডায় জুড়ে থাকতাম আমরা অনেকজন। এখন অনেকের সঙ্গে দেখাও হয় না।দাদার একটা গান আমার অনেক পছন্দের ছিলো-লিওনাল রিচির ‘হ্যালো’। দাদার কাছে গানটা আমি অনেকবার শুনেছি এবং অনেককে শুনিয়েছিও।গানের ব্যাপারে একেবারে অন্য মানুষ ছিলেন। বললেই একটার পর একটা গান শুনিয়ে যেতেন।আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।টিএসসিতে লোকজনও জড়ো হয়ে  যেতো।

বাধা ধরা পড়াশোনা শেষ করে যখন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করি তখন দাদার সঙ্গে আবার অন্য ভাবে চলা।সে স্মৃতির ভেতর জড়িয়ে আছে অন্য রঙের মুহুর্ত। অন্য ফুলের গন্ধ।তবে ভরসা ছিলো অনেক বড়ো।অনেক জানা অনেক শেখা, সেটা তো দাদার জন্যই। যেনো হাতে কলমে শেখা।

‘ভোরের কাগজ’ এর ফিচার বিভাগে দাদার সঙ্গে কাজ না করলে জানা হতো না, শেখা হতো না অনেক কিছুই।আড্ডা দিতে দিতেই কাজ চলতো। রেলগাড়ির মতো হুস করেই পেরিয়ে যেতো সময়।কিন্তু কাজটা এক নাম্বার হওয়াই চাই।

তখন `ভোরের কাগজ’ বাংলামোটরে। চারতলায় ফিচার বিভাগ।দুরন্ত দুপুর।অলস বিকেল।আড্ডা,খাওয়া-দাওয়া সব চলতো।তারপরও থেমে থাকতোনা কাজ।

মেলার মিটিং! টেবিল বাজিয়ে দাদা গান করতেন।তবে সেদিন সবার লেখাই প্রশংসিত হতো।কে ভালো লিখলো, কে খারাপ লিখলো বোঝার উপায় নেই।আমার কথাই বলি! প্রথম অ্যাসাইন্টমেন্ট! পাঠালেন এক গায়কের বাড়ি।গেলাম, ইন্টারভিউ করলাম। মেলাতে লেখাও বেরুলো।পাতাটা ধরে আমার প্রায় ঘাম ঝরছে এটা কার লেখা?? নামটা অবশ্য আমারই।এদিকে অপিসে এসে দেখি দাদা মিটিংয়ে আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মিটিং শেষে কাছে গিয়ে কিছু বলার আগেই কানের কাছে মুখ এনে আস্তে করে বললেন,‘লেখাটা আমি কিভাবে ঠিক করে দিয়েছি সেটুকু ভালো করে দেখে নিও।আর কিছু লাগবেনা।’ সে লেখাটা আমি যে কতোবার পড়েছিলাম বলতে পারবো না।তারপর আর কোনদিন এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি।

একসময় দাদার ঠিকানা ছিলো ১০ নাম্বার পরিবাগ। দাদার বড়’দির বাড়ি।জামাইবাবুর মা তখনও বেঁচে আছেন।মাঝে-মধ্যেই দাদা বলতেন,‘চলো বাসায় গিয়ে দুপুরের আহারাদি সেরে আসি।’আমি বলতাম, আমার তো সারা হয়ে গেছে আপনি যান।বলতেন, ‘যাবো তো কিন্তু ভয় করছে।’ জানতে চাইতাম, ‘কেন দাদা?’ এবার হেসে বলতেন, ‘আজ যে আমি গিনিপিগ হবো। মাঔমা  আজ বিশেষ পদ রান্না করবেন বলেছেন।আমার ওপর দিয়েই এক্সপেরিমেন্ট হবে।তুমি সঙ্গে থাকলে ভাগে একটু  কম পড়তো।উনি প্রায়ই এমন বিশেষ পদ রান্না করেন।আর আমিই গিনিপিগ হই।’ আমার অকুতোভয় দাদাকে এই একটা বিষয়েই ভয় পেতে দেখেছি।যেন দাদার চেনা রাস্তা তখন চিহ্নহারা হয়ে যেতো।বড়োই উদ্বিগ্ন দেখাতো।

আমাদের এই দাদা  বড়ো প্রেমিক পুরুষ ছিলেন। কাউকেই না বলতে পারতেন না।মাছির চোখের মতো চতুর্দিকে তার প্রেমিকারা ঘুরঘুর করতো। কখনো কখনো কারো কারো কাছ থেকে পালিয়েও বেড়াতেন।অমন কেউ অফিসে আসছে শুনলে দাদা কোথায় যে লুকাবেন খুঁজে পেতেন না, শেষ পর্যন্ত অফিস থেকেই বেরিয়ে যেতেন।সে সময় তার চেহারাটা বড়ো নিরুপায়।  যেন মন নিয়ে হারিয়ে যাচ্ছেন দূরে কোথাও দূরে…

ঘন্টা ধরে রিক্সা করে বেড়ানো তার অনেক পছন্দের মধ্যে একটা বিশেষ পছন্দ ছিলো। অনেক সময়ই তার সঙ্গী হয়েছি।হুডখোলা রিক্সায় বিকেলের বাতাসে ঢাকা শহরের অনেক কিছুই দাদা আমাকে জানিয়েছেন, চিনিয়েছেন। এমন কী ফুল-লতা-পাতাও। পত্রিকা নিয়েও অনেক কথা বলতেন, লেখাটা কোথা থেকে শুরু করতে হবে,মেকাপটা কেমন হবে কত্তো কত্তো কিছু। আমি যেনো চুপ করে  বসে থাকতাম স্কুলের বেঞ্চে।

সে বড়ো সুখের ছিলো দাদার পান্তাভাত খাওয়ার দৃশ্য দেখা। প্রতিদিন প্রাতরাশে টেবিলে পান্তা দেখেই তার চোখ জুড়াতো।তবে কোরবানী ঈদে দাদার নাশতা হতো আমার বাড়িতে। পান্ত গরুর মাংস আর পোড়া মরিচ। দেখেও যেনো সুখ লাগতো।সে কী আয়েস করে খাওয়া!

গানের খোঁজেও দাদার সঙ্গে সঙ্গেই থেকেছি আমরা।সে সময়গুলো যেনো উজ্জ্বল রোদের মতো চোখে ভাসে।একবার সম্ভবত ১৯৯৯ সন।ভোরের কাগজ থেকে একটা প্রোগ্রামে আমরা কয়েকজন সিলেট যাই, সঙ্গে দাদাও। সেই প্রোগ্রামে বাউল সম্রট শাহ্ আব্দুল করিমকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়। তখনও করিম ভাই আড়ালেই ছিলেন।আমরা সেদিন প্রথম এমন জীবন্ত আইকনকে সামনে থেকে দেখি।তার প্রতিভার খবর তখনও জানা হয়নি সবার।সন্ধ্যায় করিম ভাই যখন ষ্টেজে

স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে সঞ্জীব চৌধুরী

` গাড়ি চলেনা চলেনা চলেনা রে‘ গানটা গাইলেন। আমরা মুগ্ধ!যেমন গান তেমন তার বাচনভঙ্গি!ষ্টেজ থেকে নামার পর আমরা তাকে ঘিরে ধরলাম।অনেক কথা বললাম উনার সঙ্গে।গানটা তখন দাদার মনকে ঘিরে রেখেছে। একসময় আমাকে ডেকে বললেন,`মা গানটা উনার কাছ থেকে শুনে শুনে লিখে নাও।আমি অফিসের স্লিপপ্যাডে গানের কথা লিখে দাদার হাতে দিলাম। তার পরের ইতিহাসতো সবারই জানা।`দলছুট‘এর এ গানটা এখন সবার মুখে মুখে।

আলো পড়ে আসা এক খামখেয়ালী বিকেলে গান রেকডিং এর সময় আমাকে ডাকলেন দাদা।সম্ভবত সেদিন ‘দলছুট’ এর তৃতীয় অ্যালবামের কাজ চলছে।আমি অফিস থেকে চলে যাই স্টুডিওতে। দেখি, ঠান্ডায় দাদার গলা বসে গেছে। কথা বলতে পারছেন না। ফিসফিস আওয়াজ বের হচ্ছে গলা দিয়ে।সমানে গার্গেল করে যাচ্ছেন। আমি ভাবছিলাম এ অবস্থায় গান করবেন কী করে?? বললেন, দেখি কী হয়!! তারপর ভয়েস দিতে ঢুকলেন। তৈরি হয়ে গেলো গান ‘ আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো চাঁদ’।কেউ বোঝে কিনা জানিনা তবে এখনও গানটা শুনলে আমি দাদার বসে যাওয়া গলার স্পর্শ দিব্যি টের পায়ে যাই।

শীতের রোদ্দুর খুব তাড়াতাড়ি ক্ষয় করে ফেলে তার আলো। দাদাও ঠিক এভাবেই চলে গেলেন। সব আলো বড়ো তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিলেন আমাদের উপর থেকে। এত্তোসব ভালোবাসার মানুষ রেখে নিজের বেলা ফুরিয়ে দিলেন। এতোটা তাড়া ছিলো তার আমরা জানতেও পারিনি।মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়। তাই তো মনখারাপের সঙ্গে আড়ি দিয়েই দাদাকে স্মরণ করি।

ছবি: গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199