মেঝেতে শুয়ে হকিং নিউটন, ডিকেন্স ব্রাউনিং

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 4 Jul 2024

3245 বার পড়া হয়েছে

Shoes
স্বরূপ জাহিদ (লেখক)
কৃষ্ণগহবরে স্টিফেন হকিং

অদ্ভুত ব্যাপার । অনেকক্ষন ধরে বোঝার চেষ্টা করছি । একটা মিডিয়াম সাইজের টাইলসের নীচে কিভাবে আস্ত এক মৃতদেহকে ঢুকিয়ে দেয়া গেল !! এ তো অসম্ভব । আমার হতভম্ব অবস্থা দেখে দয়া পরবশ হয়েই মনে হয় মুচকি হাসি দিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালেন টকটকে লাল গাউন পড়া ফাদার । “ কী অবাক হচ্ছো ? এটাই এখানকার সর্বশেষ কবর, বুঝলে । গত মার্চে সমাহিত করা । উনি ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন না । তাই ভস্ম বানিয়ে সমাহিত করা হয়েছে । দেখ না এক টাইলসেই এটে গিয়েছে । ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান । তোমার মঙ্গল হোক ।” বলে চোখের নিমিষেই যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন ফাদার । তাই তো । আমাদের সময়ের বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী ও পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং তো ঈশ্বরবাদী ছিলেন না। তাই আ্যাবেতে তিনি এক টাইলসের নীচে!!

দুই দুইটা ঘন্টা কড়া রোদে লাইনে দাডিয়ে টিকেট কেটে মাত্র ঢুকেছি আ্যাবেতে । ওয়েষ্টমিন্সিটার আ্যাবে । বিলেতে এসে পৌছেছি মাত্র একদিন । হোটেলের রিসিপশনের ছেলেটা ম্যাপ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল বলে রক্ষা । নইলে লন্ডনের সাবওয়েতে চক্কর খেতে থাকতাম ! লন্ডন মাষ্ট সি র গুগল বিবেচনায় উপরের দিকেই আছে ওয়েষ্টমিন্সটার অ্যাবে ।সেন্ট্রাল লন্ডনে পার্লামেন্ট হাউস সংলগ্ন প্রাচীন এই গীর্জাটি তাই খুজে পেতে কোন সমস্যাই হয়নি । কিন্তু আ্যাবে কি শুধুই গীর্জা? বাইরে থেকে কিন্তু তাই মনে হয়। বিষয়টা মোটেই তা নয়।

অথচ শুরুতে কিন্তু তাই ছিলো। একেবারেই সাধারন গীর্জা। নির্মান শুরু হয়েছিল ১০৬৫ সালে। সেইন্ট এডওয়ার্ড নির্মান কাজের মুল পুরোধা ছিলেন। বলা যায় গীর্জা বানিয়ে পাপ মোচনই ছিল তার উদ্দেশ্য। ওই বছরেই ২৮ ডিসেম্বর সাধারন মানুষের প্রার্থনার জন্যে প্রথমবারের মত খুলে দেয়া হয় আ্যাবে। অবশ্য শুধু প্রার্থনা নয়, অনেকটা আশ্রমে রূপ নেয় গীর্জাটি। তারপর অনেক সময় গডিয়েছে। রাজা তৃতীয় হেনরি ১২৪৫ সালে গীর্জাটি পুননির্মান শুরু করেন। আজকের ওয়েষ্টমিন্সটার এর আদলটি তার সময়ই নির্মিত। প্রাচীন ইউরোপিয়ান মুগ্ধকর স্থাপত্য নির্মান শৈলি আর পর্যটকদের তীব্র আকর্ষন বিবেচনায় ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো এটি অন্যতম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষনা করেছে।গেপ

পায়ের তলায় শেষ ঠিকানা

ওয়েষ্টমিন্সটার কি শুধুই গীর্জা? মোটেই তা নয়।ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কালের স্বাক্ষী ও প্রাচীন এই স্থাপনাটি। রাজ্যাভিষেক থেকে শুরু করে চিরশায়িত করার স্থানও এটি ব্রিটিশদের। শুধু তাই নয় রাজপরিবারের জমকালো বিয়ের অনুষ্ঠানও হয় এখানেই। প্রিন্সেস ডায়ানা ও রাজকুমার চার্লসের বিয়ে যেমন এখানে হয়েছে তেমনি ডায়ানা পুত্র উইলিয়ামের বিয়ে ও হালে এই আ্যাবেতেই সম্পন্ন হয়েছে। অথচ ডায়নার আরেক পুত্র প্রিন্স হ্যারী কিন্তু পারেননি এখানে বিয়ে করতে। হ্যারী বধু অভিনয় শিল্পী মেগান কুমারী ছিলেন না। তাই এই পবিত্র আ্যাবেতে তার বরণ হয়নি। কী কঠিন নিয়মের বেড়াজালে বন্দী ব্রিটিশ রাজপরিবার । এরকমই আরো কঠিন সব নিয়মের সংগে জড়িয়ে আছে এই আ্যাবে।গেপ

আগেই জানতাম আ্যবেতে বিশ্বের বিখ্যাত সন্তানরা ঘুমিয়ে আছেন। মনের ভিতরে চরম বাসনা ছিল তাদের সমাধি দেখার। ব্রিটিশ রাজারানীদের সমাধি দেখার চাইতে আমাকে বেশী টানছিলো বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কবিদের সমাধি। আর তাই বিশাল লাইন পেরিয়ে যথন টিকেট হাতে পেলাম উত্তেজনা তখন চরমে। প্রধান ফটকটি শত শত বছরের পুরোনো। কাঠ দিয়ে তৈরী । হাত বুলিয়ে চোখ বুজে কিছু সময় দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম দরজাটি কত কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তবে বিষ্ময়ের ধাক্কা কিন্তু তখনো বাকী । আ্যাবেতে প্রবেশের প্রশস্ত পথে হাঁটা শুরু করেছি মাত্র। খেয়াল করিনি পায়ের নীচে কী লিখা!

ওয়েষ্টমিন্সিটার আ্যাবে

এগিয়ে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভাবলাম পুরো প্যাসেজজুড়ে কি লেখা একটু দেখি। তাই আবার ফিরে এলাম দরজায়। চোখ রাখলাম মেঝের লেখায়। সংগে সংগে বেদনায় মনটা ভরে গেল। ইংরেজী পড়ে যা বুঝলাম তার অর্থ দাঁড়ায়, এই মেঝের নিচেই চিরশায়িত বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন। অবহেলায় শুয়ে আছেন তিনি। মানুষের ভীড়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। অনেকটা ধাক্কা খেয়েই ডারউইনকে পায়ে মাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আর সতর্ক চোখ রাখছিলাম মেঝেতে। মেঝে জুড়ে শুধু কবর আর কবর। আর তার উপর দিয়ে হেটে বেড়াচ্ছে পর্যটকরা। কে নেই?? ডারউইন দিয়ে শুরু। যে কয়জনের নাম পড়তে পেরেছি তাদের মধ্যে আছেন স্যার আইজ্যাক নিউটন, বায়রন, রবার্ট ব্রাউনিং, চার্লস ডিকেন্স, জেফরি কুচার, বেন জনসন, আলফ্রেড লর্ড টেনিসন, জন মেসফিল্ড, টমাস ক্যাম্পবেল আর স্টিফেন হকিং। আমারএই স্বল্প দর্শনে এই কয়টি নামই চোখে পডেছে। পৃথিবীর উজ্জ্বল সব মানুষ শুয়ে আছেন আ্যাবের মেঝের নীচে চরম অবহেলায়। অবহেলা বললাম এই কারণে, বিশ্বের এইসব বিখ্যাত মানুষ এই ধরণীকেদিয়েছেন দুহাত ভরে। বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্পে তাদের অবদান বিশ্বকে বদলে দিয়েছে আধুনিকতায়। অথচ এইসব নক্ষত্রের শেষ জায়গা কিনা গীর্জার মেঝের নীচের স্যাঁতসেতে মাটি । সমাহিত করার প্রক্রিয়াটি আরো বেদনাদায়ক । গেপপ্রাচীন এই আ্যাবের মেঝে তৈরী হয়েছিল শক্ত কালো পাথর দিয়ে। শত শত বছর ধরে ব্রিটিশ নক্ষত্রদেরই এখানে কবর দেয়া হয়। এরকম কোনো বিখ্যাত কেউ মারা গেলে শক্ত পাথর উঠিয়ে কফিন ঢুকিয়ে দেয়া হয়। তারপর তার উপরে টাইলস দিয়ে ঢালাই করে মৃতের নাম ও পরিচয় লিখে দেয়া হয়। এভাবে শত শত বছরে আ্যবের মেঝে রূপ নিয়েছেকিম্ভুত কিমাকারে। কোথাও লাল, কোথাও খয়েরী, কোথাও সোনালী বা কালো। প্রকৃত শক্ত পাথুরে মেঝে এখন কবরের মাঝে খুঁজে পাওয়াই ভার। এভাবেই আ্যাবের মেঝেতে শত শত বিখ্যাত মনীষীদের কবরের উপর দিয়ে হেটে বেড়ায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ। এপিটাফে শ্রদ্ধার ব্যবস্থা তো দুরের কথা, ইতিহাসের এই মহানায়কদের এখন স্থান আমজনতার পায়ের নীচে। কী লজ্জা।ব্রিটিশদের কোন মানসিকতা থেকে এর উদ্ভব, এটা তারাই ভাল জানে। তবে একদম শেষ দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় দুটি চমকপ্রদ জিনিস দেখলাম। দরজার বাপাশে রাজ্যাভিষেক চেয়ার। কাঁচদিয়ে ঘেরা একটি উঁচু সাধারন কাঠের চেয়ার। এই চেয়ারে সর্বশেষ রাজ্যাভিষেক হয়েছে বর্তমান রানী দ্বিতিয় এলিজাবেথের, ১৯৫৩ সালের ২ রা জুন। এরপর থেকেই এই চেয়ার কাঁচবন্দী। আর এই কাঁচবন্দী ঘরটির ঠিক পাশেই আ্যবের দরজার মুখোমুখি মেঝেতে শুয়ে আছেন ইতিহাসের আরেক অন্যতম রাজনীতিবিদ উইনস্টন চার্চিল। নিয়তির পরিহাস। মানুষের পদধূলি থেকে বাদ যাননি তিনিও। গেপ

ব্যতিক্রম কি নেই? অবশ্যই আছে। অবাক করার মতো ব্যাপার হচ্ছে, রাজপরিবারের সদস্যদের কবর কিন্তু মেঝেতে নয়, বরং রীতিমত সমাধি করে এপিটাফ দিয়ে বাঁধানো। রাজা হেনরী ৩,এডওয়ার্ড ১ এবং ৩ থেকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সবাই কিন্ত শায়িত আছেন বেশ সম্মান নিয়েই। অথচ মেধাবী নক্ষত্ররা ঘুমাচ্ছেন মেঝেতে কি নিদারুন অবহেলায়। একেই বলে বৈষম্য।

বেদনাদায়ক এক অনুভুতি নিয়ে বেরিয়ে এলাম ওয়েস্টমিন্সটার আ্যাবে থেকে। স্টিফেন হকিংসের কালো টাইলসের উপরে আঁকা কৃষ্ণগহবরের ছবিটা ভুলতে পারছি না কিছুতেই। বার বার মনেহচ্ছিল শেষবার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার আগে হকিং কী ভেবেছিলেন তাকে এধরনের অপমান সইতে হবে? ভাবেননি হয়তো!!

ছবিঃ লেখক

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199