...আর গোপনীয়তা

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 13 Jun 2024

3585 বার পড়া হয়েছে

Shoes
স্বরূপ জাহিদ (লেখক)

- ভাই, স্টোরিটা আমারে দ্যান... - নাহ্! - ক্যান? আপনার পত্রিকা তো এই স্টোরি ছাপবে না। আপনে ঘটনা নিজ চোখে দেখছেন। স্টোরিটা হজম কইরা কি লাভ বস? এরকম একটা বোমা স্টোরি... ছাপাইলে পুরা শহরে ঠাডা পড়বো। দ্যান বস প্লীজ। - না রে ভাই, আমি এরকম স্টোরি করি না। এক নিউজে এদের দুইজনেরই ক্যারিয়ার শেষ। কি দরকার, বাদ দেন। কথোপকথনটি আজ থেকে ২৫ বছর আগের। তখন কাজ করি একটি জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিকে। আরেক পত্রিকার ছোটভাইকে জাস্ট দুইদিন আগে দেখা একটা ঘটনার অংশবিশেষ শেয়ার করছিলাম। তো সেই রিপোর্টার ছোটভাই পুরো ঘটনা শোনার জন্যে আর স্টোরি করার জন্যে চাপাচাপি করেছিলো। স্টোরিটা হলেই পত্রিকার ধুন্ধুমার কাটতি। হবারই কথা। স্টোরির কুশীলবরা যে তখনকার বিনোদন জগতের হার্টথ্রব জুটি। তাদের খবর এমনিতেই চড়ামুল্যে বিকোয়। আর আমার দেখা দরজার ওপাশের খবরটি শুধু চড়ামূল্যেরই নয়, আকাশের এই দুই তারকাকে নিমিষেই মাটিতে নামিয়ে দেবে। কারণ, এটা খবর নয় স্রেফ স্ক্যান্ডাল।

শুধু কি নিউজ? নব্বুই দশকের মধ্যভাগে সাংবাদিকতার কাজে গেলাম ঢাকার এক নাইট ক্লাবে। উদ্দেশ্য ঢাকার নাইট লাইফ নিয়ে রিপোর্ট করবো। ফটোগ্রাফার সঙ্গে নিলাম। ডান্স ফ্লোরের ছবি লাগবে।কিন্তু ক্লাবের ম্যানেজার ফটোগ্রাফারকে ঢুকতেই দিলেন না। কারন দেখালেন, এখানে সমাজের অনেক পরিচিত মানুষ আসেন। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা, চিত্রজগতের মানুষজন তাদের সঙ্গীদের নিয়ে আনন্দ করেন, নাচেন। এই ছবি তুললে বা প্রকাশিত হলে স্ক্যান্ডাল হবে। নাইটক্লাবের সুনাম ক্ষুন্ন হবে। এরা আর কেউ আসবেন না ক্লাবে। এরা স্ক্যান্ডাল ভয় পান। পুরো সমাজ স্ক্যান্ডাল ভয় পায়। অগত্যা আমি নিজেই খালিচোখে সেদিনের নাইটক্লাবে উদ্দাম নৃত্য দেখেছিলাম। এবং সেখানে তখনকার তারকারা তো ছিলেন বটেই।

স্ক্যান্ডাল বা গোপন গল্প আমৃত্যুই মনে হয় তাড়া করে বেড়াতো তখনকার তারকাদের। চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল, সালমান শাহ থেকে এরশাদ-জিনাত বাদ থাকতেন না কেউই। নিত্য নতুন গল্পে, কভারস্টোরিতে ছেয়ে থাকতো ফুটপাতের পত্রিকার স্টলগুলো। শুধু তারকা বা রাজনিতীবিদরাই নন, আলোচনায় থাকতো খুনী বা টপটেরররাও। মধ্যআশির রীমা হত্যা মামলার খুকু মুনিরের স্ক্যান্ডাল যেমন কেউ আজো ভুলতে পারেনি তেমনি খুনী এরশাদ শিকদারের নারীশিকারের অভিনব পন্থাও আড্ডার টেবিলে এখনো জীবন্ত। জেলখানায় টপটেররদের নারীসঙ্গ ইদানীং প্রসঙ্গে আসলেও তা স্ক্যান্ডাল হয়ে পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে সেই আশির দশকেও। স্ক্যান্ডালে এতোটাই ভয় ছিলো সেই সময়টায়। একটু পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেই বুকে ধুকপুক। এই বুঝি স্ক্যান্ডালে জড়ালাম। একটা স্ক্যান্ডালেই সব শেষ। সেখানে যোগ্যতা, নিষ্ঠা, সততার কোনো মুল্যায়ন নেই। রংচংয়ে তারকাখ্যাতি নিমিষেই উধাও। যেহেতু নেট দুনিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার জন্মই হয়নি তখন, তাই স্ক্যান্ডাল পুরোটাই ভর করতো পত্রিকায়।

মুলধারার পত্রিকাগুলো স্ক্যান্ডাল নিউজ করতো রয়েসয়ে, কিন্তু ম্যাগাজিন বা চলচিত্র বিষয়ক পত্রিকার প্রধান শিরোনামই থাকতো নিত্যনতুন স্ক্যান্ডাল। যতো স্ক্যান্ডাল, ততো কাটতি। এতটাই কাটতি হতো যে, ৯০ দশকের শেষভাগে এসে রীতিমতো ঘোষনা দিয়ে বাজারে এলো দেশের প্রথম ট্যাবলয়েড দৈনিক মানবজমিন। প্রকাশনাশিল্পে স্ক্যান্ডাল নিউজের পথিকৃত বলা যায় পত্রিকাটিকে। আর এসব কারনেই সেই সময়ের তারকা বা পরিচিত মুখরা সর্বদা ঘনিষ্ট সম্পর্ক রাখতেন সাংবাদিকদের সংগে। তোয়াজ করে চলা যাকে বলে। ব্যতিক্রমও ছিলো। অনেক তারকা মোটেও পাত্তা দিতেন না এইসব স্ক্যান্ডালকে। তাদের কাছে এগুলা ছিলো শুধুই সস্তা খবর। আর তাই বেপোরোয়া জীবনযাপন তারা উপভোগই করতেন। মনে আছে, নব্বই দশকের কোনো এক থার্টি ফার্স্ট নাইটে গুলশানের একটি নামকরা হোটেলে পার্টি চলা অবস্থায় ছোটপর্দার হার্টথ্রব নায়ককে বের করে দেয়া হয়েছিলো মদ্যপান করে মাতলামি করছিলেন বলে। তিনি হোটেল থেকে বের হয়ে গুলশানের জনবহুল রাস্তায় সাধারন জনতার সঙ্গে মিশে মাতাল অবস্থাতেই নতুন বছর বরণ করলেন। আমি নিজে তার সঙ্গি ছিলাম এবং এটা যে স্ক্যান্ডাল হতে পারে সেটা নিয়ে তাকে একটুও চিন্তিত হতে দেখিনি। সারাজীবনই তিনি স্ক্যান্ডালকে থোরাই কেয়ার করেছেন। তাতে তার দর্শকপ্রিয়তা কমেনি একটুও। বরং দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বিনোদনজগত পুরো নব্বই দশক।

আজ এই অভিনব অন্তর্জাল আর সামাজিক যোগাযোগের সময়টাতে স্ক্যান্ডালের ধরনটাই পাল্টে গেছে। গোপন গল্পে পাঠক আর চমকিত হন না। ফেসবুকে শত শত অনলাইন পোর্টালে হাজার হাজার স্ক্যান্ডাল নিউজ ভেসে বেড়ায়। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে পাঠক নিউজে ক্লিক করলেও নিছক ফান হিসেবেই গোপন গল্পটি পড়ে ফেলেন। এক্ষেত্রে যেহেতু ধরেই নেয়া হয় যে, ইন্টারনেট ফেসবুকের বেশীরভাগ খবরেরই সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে, তাই পাঠক পড়ে যান সংশয়ে। আর তারকারাও থাকেন একধরণের স্বস্তিতে। প্রশ্নবান তৈরী হলেও তারকারা উপেক্ষা করে যেতে পারেন সত্যতার দোহাই দিয়ে। আর তাই প্রকৃত স্ক্যান্ডাল হারিয়ে যায় সহজেই। পাঠক আর বিস্মিত হন না, খোঁজও রাখেন না এসবে। যেনো রূপকথার গল্প। পড়া শেষে ভুলে যাওয়া।

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199