তার অনুপস্থিতিতে

ইরাজ আহমেদ

সাহিত্য সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 19 Sept 2024

3400 বার পড়া হয়েছে

Shoes

উর্মি রহমান বিদায় নিলেন পৃথিবীর জীবন থেকে। সাংবাদিক, লেখক উর্মি রহমান। দীর্ঘদিন ধরে কর্কট রোগ আর চোখের অসুখের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। তারপর ১৪ সেপ্টেম্বর আচমকা এক যুদ্ধের ওপর নেমে এলো পূর্ণচ্ছেদ। এখন  অনুপস্থিতির ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। জীবনের সমস্ত কাজ, উর্ধশ্বাস ছোটাছুটি, নিমগ্নতা, সংসারের দৈনন্দিন ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে শুরু করে লেখার টেবিল-সর্বত্রই জমে থাকবে অস্বস্তিকর নীরবতা, স্মৃতিচিহ্ন আর স্বজনদের হাহাকার।

উর্মি রহমান বসবাস করতেন পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। বহুদিন ধরে বৈবাহিক সূত্রেই সেখানে বসবাস। বাংলাদেশের খুলনা জেলার মানুষ ছিলেন। একদা কাজ করেছেন লন্ডনে বিবিসি‘র বাংলা বিভাগে। তার আগে ঢাকায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং প্রেস ইন্সটিটিউটে।

শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আমাদের পরিবারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কোনো আত্মীয়তার বন্ধন ছিলো না কিন্তু মনে হতো আত্মীয়ের চেয়েও কিছু বেশি ছিলেন।  তাকে খালা বলে সম্বোধন করতাম। উর্মি খালার বই পড়ার ভীষণ নেশা ছিলো। উনি যখনই আমাদের বাসায় আসতেন আমার জন্য গল্পের বই নিয়ে আসতেন। মাঝে মাঝে প্রেস ইন্সটিটিউটের দারুণ সমৃদ্ধ লাইব্রেরী থেকেও বই এনে দিতেন। তখন আমি স্কুলে পড়ি। খালা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটদের জন্য লেখা গল্প আর উপন্যাসগুলো লাইব্রেরী থেকে এনে আমাকে পড়তে দিতেন। বলতেন, বিভূতিভূষণ মন দিয়ে পড়ো;প্রকৃতিকে চিনতে পারবে।

সত্যই চাঁদের পাহাড়, হীরামানিক জ্বলে, তালনবমী পড়ে দেখার দৃষ্টি পাল্টে গিয়েছিলো আমার। মনের মধ্যে এক অজানা পৃথিবীর জন্য মন কেমন করা অনুভূতি তৈরি হয়েছিলো। উর্মি খালাকে এই কথাগুলো কোনোদিন বলাই হয়নি। লিখতে লিখতে মনে পড়লো, বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনে প্রবেশ করার পর একদিন উর্মি খালাকে বলেছিলাম আমি কবিতা লিখি। আমাকে কবিতাসহ পাঠিয়ে ছিলেন তৎকালীন দৈনিক দেশ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কবি হেলাল হাফিজের কাছে। হেলাল হাফিজ আরেকজন অপূর্ব মানুষ। আমার প্রথম লেখা কবিতাগুলো পড়ে আবার নতুন করে লিখে নিয়ে যেতে বলেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পরে দৈনিক দেশ পত্রিকার সাহিত্য পাতায় আমার তিনটি কবিতা ছাপা হয়েছিলো। বড় কাগজে সেই প্রথম আমার কবিতা মুদ্রিত হওয়া। খালা খবরটা শুনে খুব খুশি হয়ে বলেছিলেন, বেশি বেশি কবিতা লেখো। তাকে কোনোদিন বলাই হয়নি, সেই কত বছর আগে তার ওই উৎসাহটুকু  আমার জন্য মারাত্নক ইতিবাচক ছিলো।

উর্মি খালা খুব স্বপ্রতিভ আর উচ্ছ্বল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে তার শান্ত স্বভাবের কারণে তাকে কখনোই উচ্চকিত বলে মনে হয়নি। নিজের কাজটা করে যেতেন। স্মার্ট জীবনদর্শন ছিলো তার। কিন্তু এখনকার সময়ের বহু মানুষের মতো শুধু পোশাক আর কথার ফুলঝুরিতে তা পর্যবসিত হতে দেখিনি। কলকাতায় বহু আন্দোলন, মিছিলে তিনি সক্রিয় ভাবে অংশ নিতেন। বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি তার ভালোবাসা ছিলো গভীর। বিশ্বাস করতেন মানুষ এবং মানুষের সমান অধিকারে।

উর্মি খালা খুব ভালো রান্না করতেন। বলতেন কলকাতায় তার বাসায় গেলে অনেক কিছু রেঁধে খাওয়াবেন। আমার আর যাওয়াই হলো না। শেষবার আমাদের ঢাকার বাসায় যখন এলেন তখন কত গল্প হলো আমাদের। আমার স্ত্রী আবিদা নাসরীন কলি তাকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ালো। সেই থেকে কলির সঙ্গে তার সখ্যের শুরু। তাদের মধ্যে ফোনে কথা হতো। কলি খালাকে লিখতে বললো তার সম্পাদনায় প্রকাশিত অনলাইন সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রাণের বাংলায়। এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। কত ধরণের লেখা যে পাঠিয়ে দিতেন নিজের অসুস্থতা উপেক্ষা করে। প্রাণের বাংলায় তার দু‘টো দীর্ঘ ধারাবাহিক লেখাও প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে একটা তার নিজের জীবন কথা। আসলে মানুষের সঙ্গে খুব সহজে মিশে যাবার অদ্ভত ক্ষমতা ছিলো তার মধ্যে।

পৃথিবী থেকে বিদায় নিলে মানুষ শোকসভা হয়ে যায়। উর্মি খালা অবশ্য আমার কাছে কখনোই শোকসভা হয়ে থাকবেন না। খুব কাছের একজন মানুষের অনুপস্থিতি আর তার স্নেহের স্মৃতিটুকু আমার সঞ্চয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে বাকিটা জীবন।

ছবিঃ সংগ্রহ

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199