আমার শান্তিনিকেতন ৮

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 24 Jan 2019

2380 বার পড়া হয়েছে

Shoes
অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

করবী হোস্টেলটা কিন্তু সন্তোষালয়ের চেয়ে এক্কেবারে অন্যরকম। যাকে বলা চলে আধুনিকা। ছাতিম তলার উল্টো দিকে এই খোলামেলা দোতলা বাড়িখানি আলো- হাওয়ায় ভরপুর। আছে ব্যালকনি নামক অখণ্ড অবসর যাপনের কৌণিক সুখ। আছে সেই দীর্ঘদেহী শিমূল গাছ। আর আছে বয়ঃসন্ধির নানা ওঠাপড়া। সন্তোষালয়ের মতো ফ্রেস্কো নেই, নেই কৌলীন্যের গরিমাও তবু চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীদের এই হোস্টেলখানা বড় ভালো লেগে গেলো। রানীদি ,বনানীদিকে ফেলে এলাম বটে, তবে তার আফসোস মিটিয়ে দিলেন মাধুরীদি, কেতকীদি বা আরও পরে উমাদি। ছুটির দিনে মাধুরীদি আমাদের হাতের কাজ শেখাতেন, মিষ্টি বানিয়ে খাওয়াতেন। কেতকীদি শেখাতেন সরু সুতলির অপূর্ব ম্যাকরম। আমরা শিকে বানাতাম,চুড়ি বানাতাম। কাজ যেমনই হোক তারিফ পেতাম অফুরন্ত। কেতকীদিকে চলে যেতে হলো দূরে। সেই পাটনায়।যেখানে ওনার নতুন সংসার। আমরা মুখ ভার করলাম, অভিমান করে কথা বললাম না, কেতকীদি চলে গেলেন চোখের জলে ভাসতে ভাসতে। বিচ্ছেদ নামক বস্তুটি আমাদের জীবনে তখন নতুন আমদানী। জীবন তো আর থামে না! গাছে কুল পাকে, আতা পাকে, পাকে বিলাতি আমড়া। সেদিন দুপুর বেলা, মেঘ করেছে বুঝিবা। আমি আর প্রীতিকণা সবে এক বাটি আমড়া মাখা নিয়ে কৈশোর উদ্‌যাপনে ব্যস্ত। এমন সময় ভারী গ্রিলের দরজায় শব্দ। বাগানের গেট ঠেলে একজন অচেনা মহিলা আসছেন। হাতে ভারী স্যুটকেশ। অপূর্ব সুন্দর মুখখানি পথশ্রমে ক্লান্ত। যদি বলেন,’ দরজা খুলে দাও ‘ তবে তো আমড়া ফেলে দৌঁড়তে হবে! আমরা তাই খাটের তলায় বাটি হাতে আশ্রয় নিলুম। বাকিরা ঘুমোচ্ছে। নীতিবোধ আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেনি কোনোকালেই তবু খানিক অপেক্ষার পর মায়া হলো। দিলুম দরজা খুলে। তখন কি আর জানি উনিই উমাদি। আমাদের প্রাণের মানুষ হয়ে উঠবেন তিনি একদা। করবী হোস্টেলের সঙ্গে উমাদির দীর্ঘ স্মৃতি বারে বারে স্মৃতিমেদুর করে তোলে আমায়। আমাদের প্রতি হোস্টেলেই ছিলো একখানি করে দেওয়াল পত্রিকা। করবী’র পত্রিকাটির নাম শ্যামশিখা। হাতে লেখা পত্রিকা যেমন হয় আর কি! আবেগে ভরপুর। বিশেষ বিশেষ দিনে শ্যামশিখা প্রকাশিত হতো। যেমন, বসন্ত উৎসব, নববর্ষ, ঘন ঘোর বর্ষায়। আর ছিলো বিশেষ এক দিন। করবী’র জন্মদিন। সেদিন সকাল থেকেই সাজো সাজো রব। আমরা আলপনা দিতাম, কাগজের শিকল দিয়ে স্টাডিরুম সাজাতাম। নিজেরাই অনেক দিনের চেষ্টায় নাটক করতাম, গান করতাম। মাস্টারমশাইরা কেউ কেউ আসতেন।আমাদের সাজিয়েও দিতেন নাটকের উপযোগী করে। সেবার আমরা ঠিক করলাম আমরা আমাদের উপাচার্যকেও নেমন্তন্ন করবো। হোস্টেলের জন্মদিন বলে কথা! সব্যসাচীদা, মানে সব্যসাচী ভট্টাচার্যের কাছে ফোনও গেলো। আমরা কি আর জানি কে সব্যসাচী ভট্টাচার্য, ইতিহাস চর্চায় কী তার অবদান! আমরা তাঁকে চিনি সব্যসাচী’দা বলেই। যিনি প্রতিদিন আমাদের বৈতালিকে এসে দাঁড়ান,সস্ত্রীক। লম্বা লম্বা হাত দুলিয়ে যখন তিনি শালবীথি পেরিয়ে আসেন তখন আমরা বিষ্ময়ে দেখি। এটুকুই। জন্মদিনের সন্ধ্যায় আমন্ত্রিতরা আসছেন একে একে। হঠাৎ দেখি সব্যসাচী’দা, সঙ্গে বৌদিও। অবাক হতে আরও কিছু বাকি ছিলো। এত বড় বড় ট্রে ভর্তি মিস্টি! সব নাকি আমাদেরই জন্য। সারা সন্ধ্যে বসে আমাদের নাটক দেখলেন, গান শুনলেন, কে যেন সেতার বাজালো তাও শুনলেন। খেলেনও সম্ভবত। আমাদের সঙ্গে বসেই।যাবার সময় বলে গেলেন, আগামী সপ্তাহে আমদের বাড়িতে তোমাদের নেমন্তন্ন। ও মা! সত্যি, নির্দিষ্ট দিনে আমাদের জন্য বাস এলো। আমরা ফ্রক পরে, চুল আঁচড়ে চেপে বসলুম বাসে। সামান্য রাস্তা, এ তো আমরা হেঁটেই যাই। আজ খাতির কত! উপাচার্যের বাংলোয় নামতেই দেখি দরজায় তাঁরা দুজন দাঁড়িয়ে আছেন । ভিতরে ঢুকলাম । সুন্দর কেয়ারি করা বাগান। প্রশস্ত ঘাসের লন। বললেন , তোমরা বাগানে খেলো। কোনো ভয় নেই। আমরা সারা বিকেল বাগানে খেললাম। ফুল দেখলাম।গান গাইলাম। উনারা দুজন চেয়ার পেতে আমাদের খেলা দেখলেন, গান শুনলেন, কত অবান্তর প্রশ্নের জবাব দিলেন। গোধূলিবেলায় আমাদের জন্য কত রকমের খাবার এলো থরে থরে। বললেন,’ তোমরা কোকো খাও সে’কথা আমরা তো জানতাম না! ভুল করে কফি করে ফেলেছি।‘... আমাদের আনন্দ তখন দেখে কে? আমরা তো কফি খেতেই চাই! সেই বিকেল খানি অনন্ত গোধূলিবেলার মতো আজও কেমন স্থির হয়ে আছে, শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, কৃতজ্ঞতায়। তাঁরাও তো শিক্ষক ছিলেন। স্বার্থপর দৈত্যের বাগানের মতো তাঁরা তো প্রাচীর তোলেননি। আমরা ছোট বলে তো ,সৌজন্য বোধের অভাব দেখাননি! শান্তিনিকেতন আশ্রমের ভিতরের কথাটিকে তাঁরা অন্তরে অনুভব করেছিলেন। পূর্বপল্লীর রেল লাইনের ওপাড় থেকে যখন প্রথম সূর্য ওঠে, তখন আজও আমি দেখি সেই শান্ত সৌম্য শিক্ষক শালবীথি পেরিয়ে হেঁটে আসছেন। আমি কোনোদিন তাঁর ক্লাস করিনি, তবু তখন আমার নিজেকে তাঁর ছাত্র ভাবতে বড় ভালোলাগে। বড্ড ভালোলাগে।

ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199