এই শহরে টাপুর টুপুর

ইরাজ আহমেদ

সাহিত্য সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 4 Jan 2018

2830 বার পড়া হয়েছে

Shoes

মাঝে মাঝে মনে হয় ফেলে আসা সময়ের স্মৃতি কেমন অন্যমনষ্ক হয়ে মনের প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায়।হঠাৎ চোখাচোখী হয়ে গেলে তাদের ডেকে আনি আবার। একা কথা বলি, তাদেরকে আবার দেখতে চাই ভালো করে, শুনতে চাই তাদের কথা। আবার কিছু স্মৃতি তেমনই অন্যমনষ্ক থেকে হারিয়ে যায় কোন অলিগলি ধরে মন তার খবরও রাখে না। আজও লিখতে বসে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো পুরনো এক স্মৃতির সঙ্গে। স্মৃতির হাত ধরে পুরনো তোরঙ্গ থেকে বের হয়ে এলো একদা বিখ্যাত ছোটদের পত্রিকা ‘টাপুর টুপুর’।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ থেকে প্রকাশিত হতো শিশু-কিশোর পত্রিকা ‘টাপুর টুপুর’।দু‘রঙে আঁকা প্রচ্ছদ, ভেতরটা সাদাকালো।কিন্তু কী উজ্জ্বল এক মাসিক কাগজ ছিলো টাপুর টুপুর। মনে আছে ছোটবেলায় গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতাম খুব সাধারণ মানের নিউজপ্রিন্টে ছাপা হওয়া পত্রিকাটির জন্য। সম্পাদনা করতেন প্রয়াত শিশু সাহিত্যিক এখলাস উদ্দিন আহমদ। পত্রিকাটির কেন্দ্রীয় দপ্তর ছিলো চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গী বাজার রোডে। তবে ঢাকার ৬৭ প্যারী দাস রোডে ছিলো টাপুর টুপুরের সম্পাদকীয় বিভাগের কারযালয়। পত্রিকাটির প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে নাম আছে শিল্পাচারয জয়নুল আবেদীনের নাম। নিয়মিত পত্রিকার অঙ্গসজ্জা করে দিতেন কাইয়ুম চৌধুরী, আবুল বরক আলভী।কে লিখতেন না তখন এই পত্রিকায়? কবি শমিসুর রাহমানের কবিতা, সরদার ফজলুল করিম, কবি আহসান হাবীব, করুণাময় গোস্বামী, কথা শিল্পী আলাউদ্দিন আল-আজাদ, শওকত আলী, সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ূন, শিল্পী নিয়ামত হোসেন, এমনি আরো কত নাম। এই সময়ের বহু খ্যাতিমান লেখক তাদের কৈশর অথবা তরুণ বয়সে লিখতেন টাপুর টুপুরের পাতায়।

টাপুর টুপুরে প্রকাশিত হতো ধারাবাহিক উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী, গল্প, কবিতা, ছড়া। আমি শৈশবে অপেক্ষা করে থাকতাম টাপুর টুপুর প্রকাশের জন্য। নতুন সংখ্যা টাপুর টুপুরের পৃষ্ঠা উল্টালেই নিউজপ্রিন্টের কেমন এক সুঘ্রাণ আমার মনকে আচ্ছন্ন করতো। আমার প্রয়াত পিতা সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ূনের বন্ধু ছিলেন এখলাস উদ্দিন। সেই মানুষটির ছবিও জমা হগয়ে আছে মনের মধ্যে। তখন আমরা থাকতাম ঢাকার নয়া পল্টন এলাকায়। একেবারে সাদা পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামা ছাড়া তাঁকে কোনোদিন দেখিনি। ফর্সা, লম্বা মানুষটি সাধারণত সকালবেলা আমাদের বাড়ি আসতেন।ে বাবা তখন নিয়মিত টাপুর টুপুরে লিখতো। চীন দেশ ভ্রমণের ওপর তাঁর একটচা লেখা ‘মহা চীন মহা বিষ্ময়’ নিয়মিত প্রকাশিত হতো। এখলাম সাহেব হাতে করে নিয়ে আসতেন টাপুর টুপুরের অনেক সংখ্যা। সেটাই ছিলো আমার কাছে এক বিশাল প্রাপ্তি।

টাপুর টুপুর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে বহুকাল আগেই। আমাদের বাড়িতে টাপুর টুপুরের কিছু বাঁধানো সংখ্যা রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে পৃষ্ঠা উল্টে দেখি। ভাবি সেই সময়ে মুদ্রণ ডন্ত্রের এতো উন্নতি ঘটেনি। ছিলো না কম্পিউটারও। কিন্তু তারপরেও কত নিখুঁত একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতো অসাধারণ সুন্দর সব লেখা নিয়ে। পত্রিকাটির সাদাকালো সব ইলাসস্ট্রেশনের দিকে এখনো আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। ছোটদের পত্রিকার যুগটা এই শহর থেকে যেনো হারিয়েই গেলো। আমাদের শৈশব, কৈশরের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠেছিলো টাপুর টুপুর। তারপর একদিন টুপ করেই কোথায় যেনো হারিয়ে গেলো। ছোটদের জন্য এমন একটি ভালো পত্রিকার অভাবটা শুধু এখন পড়ে আছে এই শহরে।
ছবিঃ সংগ্রহ

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199