আমার শান্তিনিকেতন ১৪

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 18 Jul 2019

3315 বার পড়া হয়েছে

Shoes
অমৃতা ভট্টাচার্য

মোরাম বিছানো পথ, বৃষ্টিভেজা ফুলের সৌরভ, হোস্টেলের টানা বারান্দা, বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যায় শালবীথি, আম্রকুঞ্জ। আরো দূরে খোয়াই। সব মিলিয়ে শব্দে শব্দে ভেসে থাকা শান্তিনিকেতন। প্রাণের বাংলায় সেই শান্তিনিকেতনের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করলেন কলকাতা থেকে অমৃতা ভট্টাচার্য। একদা শান্তি নিকেতনের ছাত্রী, এখন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

শান্তিনিকেতনের কথা ভাবতে বসলেই আমার শৈশবখানি সামনে এসে দাঁড়ায়। যৌবনের অগ্নিশিখাও তার কাছে যেন ম্লান। বৃষ্টিস্নাত মালতীলতার মতো শৈশবের ভারী সাধারণ দিনযাপনের অসাধার

ণ চিত্ররূপময়তা আমাকে আচ্ছন্ন করে। আমি তখন পালক কুড়োই, পাতা কুড়োই। সেগুলি যত্ন করে বইয়ের ভাঁজে রাখি। গাছ চিনি, পাখি চিনি। এই চিনে নেওয়ার মধ্যে এক ধরণের বিষ্ময়বোধ কাজ করে। গড়ে উঠতে থাকে ইন্দ্রিয়-সচেতনতাও। খোকা’দার প্রকৃতিপাঠের ক্লাসে আমি তখন সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে গাছ হয়ে উঠতে চাই। পাখি হয়ে উঠতে চাই। আরেকদিন, অমিতাভ’দার ক্লাস। ওই প্রকৃতিপাঠেরই। ক্লাসে ঢুকেই উনি বললেন, আজ আমরা হাঁটতে যাব। যেতে যেতে পথের দু’ধারের গাছ চিনবো। আমরাও দল বেঁধে প্রস্তুত। হাঁটছি, গাছ চিনছি, পাতা চিনছি। সে বড় চমৎকার! ঋতু পরিবর্তনের গন্ধ, রঙ এ’ভাবেই চিনেছি আমরা। এমন শৈশব কি ভোলা যায়?

আমাদের শৈশবের এইসব মহোৎসবে খেলনা প্রায় ছিলোই না। পেট টেপা পুতুল, চাবি ঘোরানো বাঁদর এইসব বাড়ি থেকে আনা খেলনা রাখার নিয়ম ছিলো না কারোরই। আমরা ছুটির বিকেলে বাগানে খেলতাম। অবসরে তেঁতুলতলায় ঘুরে ঘুরে তেঁতুল কুড়োতাম,। ক্লাস করতে করতে পাতাবাদাম খেতাম গ্রীষ্মের ঘূর্ণি হাওয়ায়। মাটির কাজের ক্লাসে খুব যত্ন করে মাটি মেখে দিতেন মহেন্দ্র’দা। আমরা শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর গড়েছি ঢের।তার জন্য কোনোদিন বকুনি খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। কচি হাতে আমাদের নরম মাটির হাতির শুঁড় খালি খুলে খুলে পড়তো। বিধু’দা কেবল মিটি মিটি হাসতেন। বড়োজোর এক-দুই দিন হাতে টিপে শুঁড়খানির দোল খাওয়া বন্ধ করে দিতেন। ভুল করতে দিতেন অজস্রবার। শীতের সকালে জমাট ঠাণ্ডায় যখন কনকনে শীতল মাটিতে হাত আর চলতো না, তখন আমাদের রোদে বসিয়ে বিধু’দা গল্প বলতেন। দেশ-বিদেশের কত কত শিল্পীদের জীবনের গল্প। এখন অনেক দূর থেকে দেখলে মনে হয় সেই সব সময়ের ইজেল কত শত রঙ মেখে থমকে আছে।

মাটির কাজের ক্লাসের মতোই অবাধ স্বাধীনতা ছিলো আঁকার ক্লাসেও। সেখানে তো আরও মজা! ক্লাসে বসার কোনো বাধ্যবাধতাও নেই। তুমি চাইলে ওই দূরে মাধবী বিতানের ওখানে গিয়েও বসতে পারো বা গৌরপ্রাঙ্গনের স্টেজের মাথায়। পুলক’দা, রতি’দি, কালীচরণ’দা আমাদের প্রশ্রয় দেন প্রতিদিন। সেবার আমাদের ক্লাসে এক নতুন মাস্টার মশাই এলেন। পার্থ’দা, পার্থ সাউ। ছাতাকলের মাথার উপর তখন লাল কৃষ্ণচূড়ার গুচ্ছ হাওয়ায় হাওয়ায় দুলছে। আমরাও নতুন মাস্টার মশাই পেয়ে উত্তেজিত। কখনও বলছি গল্প বলুন, কখনও বলছি আপনি একটা ছবি আঁকুন আজ, আমরা দেখি! আমাদের অবাক করে দিয়ে সেদিন সত্যি তিনি ছবি আঁকলেন আর আমরা দেখলাম কী অবলীলায় পাহাড়ের গিরিখাতে সরলবর্গীয় গাছের ছায়া আঁধার মাখে। ছাত্র- শিক্ষকের এমন নিবিড় অবস্থান শৈশবকে গভীর তৃপ্তি দেয়। গাছের সঙ্গে আকাশের যেমন মিতালি, এ-ও সেই তেমনই। আমাদের হাতের কাজের ক্লাস, মাটির কাজের ক্লাস, আঁকার ক্লাস, গল্পের ক্লাস জুড়ে সে যেন এক অবাধ স্বাধীনতার লীলাক্ষেত্র। সুরজিৎ’দার ক্লাস করতে করতে তাই কোনো এক আঁধার ঘন শ্রাবণ দিনে যেই না তাল পড়েছে ধুপ করে ওমনি দৌড় লাগায় আমার সহপাঠী কিশোরটি। ইংরেজি পড়ার চেয়ে তার যে তাল কুড়োনোয় ঢের সুখ সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। টুকরো টুকরো এমন ছবি কত কত জড়ো হয় মনের নিভৃত পরিসরে। অনেক দূর থেকে সেই মালতীলতার গন্ধ মাখা শৈশবটিকে ফিরে দেখতে দেখতে মনে হয় আমাদের মাস্টার মশাইরা আশ্রমের ভিতরের কথাটিকে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন গভীর অনুধ্যানে। আমাদের শৈশবকে তাঁরা হীনমন্যতার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেননি। আমাদের পারা, না পারা দুটোকেই তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন। নুয়ে পড়া বৃষ্টি ভেজা মালতীলতায় আমি তাই আজও শৈশবের গন্ধ পাই।

ছবি: কনকলতা সাহা

 

 

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199