হেমন্তের অরণ্যের রহস্যময় কবি

ইরাজ আহমেদ

সাহিত্য সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 28 Nov 2024

3950 বার পড়া হয়েছে

Shoes

এলেন গিনসবার্গ নিজেকে ঘোষণা করেছিলেন হোমোসেক্সুয়াল কবি হিসাবে। পৃথিবীতে সম্ভবত তিনিই প্রথম কবি যিনি নিজের যৌন প্রাধান্যকে প্রকাশ করেছেন খোলাখুলি ভাবে। ফলে একধরণের কিংবদন্তি তৈরি হয়েছিলো তাকে ঘিরে। কিন্তু বাংলা ভাষার কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কিংবদন্তি বাংলা কবিতায় ঠিক কোন জায়গায়? বেহিসাবি মদ্যপান, উশৃংখল জীবন আর বেপরওয়া জীবনবোধ?
তার কবিতা কিন্তু সে কথা বলে না। যে কবি লিখতে পারেন এমন লাইন, ‘তীরে কী প্রচণ্ড কলরব/ জলে ভেসে যায় কার শব/ কোথা ছিল বাড়ি/ রাতের কল্লোল শুধু বলে যায় আমি স্বেচ্ছাচারী!’ তখন মনে হয়, জীবনের প্রতি সব দাবি ছেড়ে দিয়ে যে কবি এমন বেপরোয়া ভঙ্গিতে নিজের কবি সত্তাকে ঘোষণা করতে পারেন তিনি তো কিংবদন্তিই হয়ে ওঠেন।

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায়, তার আত্মার গভীরে এক দুর্মর রহস্যের বসবাস ছিলো। এই রহস্যই তাকে তার নিজস্ব সময় এবং পরবর্তী সময় থেকে আলাদা করে রেখেছে। তিনি তো হেমন্তের অরণ্যে অলৌকিক পোস্টম্যান ছিলেন। সেই হেমন্ত তো আসলে কবিতার অরণ্য, সেই অরণ্য মানুষেরও। শক্তি চট্টোপাধ্যায় খুব অনায়াসে নিজের কবিতা, মানুষ অর্থাৎ পাঠক এবং এক ধরণের রহস্যময়তাকে ব্যবহার করে বাংলা কবিতার মুকুট মাথায় পরে নিয়েছিলেন।

শিশুকালে তার পিতার মৃত্যু ঘিটেছিলো। মামাবাড়িতে বড় হয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। গ্রামে কাটানো শৈশব পেরিয়ে কলকাতা এসে প্রথমে বাগবাজারে আরেক মামার বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার পর উল্টোডাঙার ঘিঞ্জিতে বেড়ে ওঠা শক্তি চট্টোপাধ্যায় কবি হয়ে উঠলেন দুর্দান্ত গতিতে। ভালোবাসা পেলেন অসংখ্য মানুষের। তৈরি হলো বাংলা কবিতায় কিংবদন্তি কবির স্থায়ী আসন। কিন্তু এত আয়োজনের পরেও আগাগোড়া থেকে গেলেন রহস্যময়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বন্ধু সমীর সেনগুপ্ত তার ‘আমার বন্ধু শক্তি’ বইতে লিখেছেন,‘‘ বহুদিন লাগবে শক্তির চরিত্রের এই রহস্যময়তার আবরণ উন্মোচন করতে, কারণগুলি বিশ্লেষণ করে কোনো যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে।... রহস্যের চাবি হয়তো পাব না, কিন্তু সেই রহস্যটিকেই তো আমরা পেয়েছি। হেমন্তের অরণ্যের সেই হরকরা, যিনি মানুষে মানুষে ব্যবধান কমিয়ে আনতে চালাচালি করেন অপ্রাকৃত চিঠি, মানুষকে ভয় পেয়ে অরণ্যে প্রবেশ করে ইতস্তত ছড়ানো বাঘের পায়ের দাগকে যাঁর উঠোনময় লক্ষ্মীঠাকরুনের পদচ্ছাপের আলপনার মতো শ্রীময় ও সুষমামণ্ডিত মনে হত, সেই কবির সঙ্গে এক পৃথিবীতে একই মায়ের স্তন্যপানের মতো— এই রহস্য বুকে নিয়েই বেঁচে যাওয়া যাবে বাকি জীবন...”

এ বছর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ৯১তম জন্মবার্ষিকীতে পৌঁছে হয়তো তার পরবর্তী প্রজন্মের কোনো গবেষক এই রহস্যময় কবি এবং কবিতার পোস্টমর্টেম করার উদ্যোগ নেবেন। হয়তো নেবেনও না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা হেমন্তের অরণ্যে শুকনো পাতার উপর পোস্টমানের মতো মৃদ শব্দ তুলে কুয়াশায় আড়াল করবে নিজেকে।

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, আমার বন্ধু শক্তি, সমীর সেনগুপ্ত
ছবিঃ গুগল

 

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199