এই শহরে নারীদের পাল্টে যাওয়া জীবন

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 10 Mar 2022

4545 বার পড়া হয়েছে

Shoes
স্বরূপ জাহিদ (লেখক)

বয়স তখন চার কি পাঁচ । সত্তুর দশকের শেষে।আমার নানীর সংগে গেলাম তাঁর এক বোনের বাসায়। সম্ভবত ধানমন্ডিতে। দুপুরে জমিয়ে খাওয়ার পর নানীর সেই বোন বললেন, চলো আপা একটু বাজারে যাই। যথারীতি দুই বোনের সঙ্গী আমিও। ডুপ্লেক্স বাড়ির নিচের একাংশে গ্যারেজ। আমার সেই নানুর হাতে গাড়ীর চাবি। দোতলা থেকে নেমে তিনি গাড়ির দরজা খুললেন। আমি বিষ্ময় নিয়ে নানুকে বললাম, গাড়ি কে চালাবে? তখন আমার সেই নানু হো হো করে হেসে উঠে তার পাশের সিটের দরজাটা খুলে আমাকে বললেন, ‘ কেনো ভাইয়া, নানুর পাশে বসেই দেখো না, নানু কেমন গাড়ী চালায়?’ আমি সেদিন একটা বড়সড়ো ধাক্কা খেয়েছিলাম। মুখ দিয়ে বেড়িয়ে এসেছিল, ‘মেয়েরা আবার গাড়ী চালায় নাকি! আমার তো ভয় করছে’। এটা শুনে নানু অট্টহাসি দিয়ে বললেন, ‘উঠে এসো। ভয় নেই। মেয়েরা সব পারে।’ সেদিনই আমার মনে হয়েছিল মেয়েরা সবই পারে। শুধু প্রাইভেট কারই নয়, এই শহরে আশির দশকে মেয়েরা কাভার্ড ভ্যানও চালাতেন। গনস্বাস্থ্যের ডা. জাফরউল্লাহ সাহেব মধ্য আশিতে বেশ কয়েকজন নারীকে নিয়োগ দিয়েছিলেন যারা সাভার থেকে কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক চালিয়ে এই শহরে ওষুধ নিয়ে আসতেন।

আজ এ শহর বদলেছে। বদলেছে মেয়েদের জীবনাচরণ। আজ মেয়েরা কার, এসইউভি বা স্কুটি চালান রাজপথে। তবে সংখ্যার বিচারে তা চার দশকে আশংকাজনকভাব কমে গিয়েছে। এখন এই শহরে গাড়ির চালকের আসনে নারীকে কম দেখা যায়। হতে পারে রাস্তার পরিবহন নৈরাজ্য তাদের যানবাহন চালনায় নিরুৎসাহিত করেছে। সত্তর আর আশির দশকে গাড়ীর মতো শহরের রাজপথ ও শ্লোগানে কাঁপিয়ে তুলতেন ঢাকার মেয়েরা। রাজনীতির তীব্রতা তখন এই শহরের মেয়েদের সক্রিয় করে তুলেছিলো। বয়স কম থাকলেও তখন মিছিলে মেয়েদের জ্বালাময়ী শ্লোগান আমিও দেখেছি। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে মেয়েদর লাঠিচার্জ আর গুলির মুখোমুখি হতেও দেখেছি। ঐ সময়টায় আমাদের বাসা ছিলো ঢাকা কলেজের পাশে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছাড়িয়ে আন্দোলন বিস্তার হতো সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত। প্রতিদিন ছাত্রদের মিছিলের অগ্রভাগে দেখতাম মেয়েদের। এমনও জেনেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটি ছাত্রী হল ছিলো অস্ত্র রাখার নিরাপদ জায়গা। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কে অনেক ছাত্র সংগঠনের নারীরা এ ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মুখ্য ভুমিকায় থাকতেন। আসলে ঐ সময়টায় মেয়েরা মাঠের রাজনীতিতে ছিলেন সরব। ষাট, সত্তর, আশি এমনকি নব্বুইতেও রাজনীতিতে মেয়েরা ছিলেন উদ্যমী, তেজী। তার প্রমাণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মতিয়া চৌধুরী, শিরীন আখতার, মন্নুজানের মতো সাহসী নারী রাজনীতিবিদ। অথচ গত দুই দশকে রাজনীতিতে মেয়েদের নতুন প্রজন্ম বড়োই উদাসীন। বলতে পারেন, রাজনীতিতে না থাকলে কি, পেশাগত উৎকর্ষতায় নারী এগিয়েছে অনকেটা পথ গত দুই দশকে। কথা সত্য। তবে পেশাজীবনে শীর্ষে পৌছানো নারীর সংখ্যা বরং কমেছে। উদাহরন দিই। ঢাকা শহরে সাংবাদিকতায় একসময় নারী সম্পাদকের জয় জয়কার ছিলো। ষাঠের দশকে শেষদিকে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের সম্পাদনায় ঢাকায ‘শীলালিপি’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৯৬৯ সালে পত্রিকাটি স্বাধীনতা বিরোধীদের টার্গেটে পরিনত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৭১এর ১৩ ডিসেম্বর মুক্তযুদ্ধবিরোধীদের হাতে শহীদ হন সেলিনা পারভীন। নারীদের জনপ্রিয় বেগম পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন নুরজাহান বেগম। লেখক- রাজনীতিবিদ লায়লা সামাদ সম্পাদনা করতেন ‘চিত্রিতা’। জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুবর্না মুস্তাফার সম্পাদনায় আশির দশকে প্রকাশিত হতো ‘ঘর সংসার’ পত্রিকা। এছাড়া ফওজিয়া সাত্তারের ‘ললনা’, আর তাসমিমা হোসেনের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘অনন্যা’ র নাম উল্লেখযোগ্য । বাংলার পাশাপাশি ইংরেজী পত্রিকারও সম্পাদনা করতেন নারীরা। শিরীন জাহিদ আর গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী তাদের মধ্যে অন্যতম। এছাড়া নব্বুই দশকেও রাখী দাশ এবং নিবেদিতা দাশ মিলে যৌথভাবে বের করতেন ‘চিহ্ন’।

আজ মিডিয়া জগতে প্রচুর নারী কাজ করছেন। দিন বদলেছে। কিন্তু এই শহরে নারী সাংবাদিকদের শানিত উপস্থিতি কমে যাচ্ছে বলেই মনে হয়েছে আমার। শুধু সাংবাদিকতা পেশাই নয়, কর্পোরেট, সরকারী বা নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন। কিন্তু শীর্ষে পৌঁছাতে যেন হাফিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। কারণ, এই শহরের পেশার সিঁড়ি আর এখন নারীবান্ধব নয়। নারীবান্ধব নয় এখন নারীদের এই শহরে চলাচল ও। আশি বা নব্বুই দশকে নারীরা চলেফেরা করতেন এই শহরে নির্বিঘ্নে। দিন বা রাত ধার্তব্যের মধ্যে ছিলো না। রিক্সা বা বাস সব বাহনেই মেয়েরা নিরাপদ বোধ করতেন। আজ এই শহরে মেয়েদের জন্যে নির্দিষ্ট যানবাহন নামিয়েও কি মেয়েদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা যাচ্ছে? এখন বিলিয়ন ডলারের এই শহরে একটি যানবাহনও নারীবান্ধব নয়। নারী পোশাকে গত দুই দশকে এই শহরে বড়ো পরিবর্তন এসেছে। আশি আর নব্বুই দশকে মেয়েদের প্রধানতম পোশাক ছিলো সালোয়ার কামিজ এবং শাড়ি। ফাল্গুন বা পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবে মেয়েরা নানান রঙের শাড়ি পরতেন। পেশাজীবী মেয়েদের প্রধান পছন্দ ছিলো সালোয়ার কামিজ। আর পশ্চিমা পোশাক যে নারীরা পরিধান করতেন না এমন নয়। তবে তা ছিলো স্থান বা উৎসব কেন্দ্রিক। আজ শহরে শাড়ি পরিহিত নারী আমার চোখেই পড়ে না। বেড়েছে বোরকা বা হিজাব। দুই দশক আগেও বোরকা মনে হয় বেশী পড়তেন চিত্রনায়িকারা। তারা পাবলিক প্লেসে নিজেকে আড়াল করার জন্য বোরকা পরতেন, যাতে তাদের কেউ চিনতে না পারে। আর আজ হিজাব ঢাকার নারীদের একটি বড়ো অংশের নিত্য পোশাক। অনেকে বলেন, নারী নিরাপত্তা এই শহরে কমে যাচ্ছে বলেই দিন দিন হিজাব বাড়ছে।পাশাপাশি আবার পশ্চিমা পোশাকও জনপ্রিয় হয়েছে এই শহরে আগের চাইতে অনেক বেশি। ঢাকা শহরের রাস্তায় অহরহ টি শার্ট বা প্যান্ট পরা মেয়ে দেখে আর নগরবাসী অবাক হন না।

কিছুদিন আগে পালিত হলো নারী দিবস। এ শহরে আজ বেশ আয়োজন করে নারীদিবস পালিত হয়। সভা, সিম্পোজিয়ামের জট লেগে যাবার অবস্থা। অথচ মাত্র এক দশক আগেও এই শহরের নারীরা খোঁজ রাখতেন না এরকম দিবসের। বদলে যাওয়া শহরে দিবস পালনের আয়োজন বাড়ছে। কিন্তু যদি বলিনারী দিবসও আজ শুধুমাত্রই একটি উদযাপন বৈ আর কিছু নয়? এই উদযাপনটা বড্ডো বেশী কর্পোরেট। তবে, যে শহরে নারী তার পেশায় শীর্ষে যেতে পারে না, রাস্তায় নির্ভয়ে চলতে পারে না, আর্থিকভাবে সচ্ছলতা থাকলেও পুরুষ সংগীর উপর নির্ভরতা লাগছে, সে শহরে দিবস উদযাপন করেই যেতে হবে আরো বহু বছর আমার প্রিয় ঢাকার নারীদের। আর হয়তো এই বিপরীতমুখী সামাজিক বিকাশের ধারায় নারীদের মাঝে কোfথাও বিষাদের ছায়াও টের পাই। সেই বিষাদ ভুলতেই কি আজকাল অনেক কর্মফেরত নারী সন্ধ্যাবেলা ভিড় জমান শহরের বিভিন্ন পানশালায়।
বদলে যাওয়া নগরীর এই নতুন জীবনাচরণ কি পারছে নারীকে স্বস্তি দিতে? এ শহর আমার অচেনা লাগে এখন।

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199