টুকরো টুকরো জমানো দৃশ্য... ৪

আবিদা নাসরীন কলি

সম্পাদক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 29 Sept 2022

3065 বার পড়া হয়েছে

Shoes

বেড়াতে গেলে টুকরো টুকরো অনেক দৃশ্য জমা হয় মনের কুঠরিতে।সেখানে নিত্য সুগন্ধি বাতাস যাওয়া আসা করে।আর ঠিক যেনো আমরা রূপকথার সোনার কাঠি ছুইঁয়ে দিয়েই মনের মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে রেখে দেই।  অবসরে মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করি।কখনও সে অলিন্দে ঢেউ উঠলে, বাতাস নেচে ফিরলে দৃশ্যগুলো চোখের সামনে আসে।খুলে যায় মনের দরজার আগল। আর এভাবেই শুরু হয়ে যায় আমাদের গল্প বলা।আমার ঘুরে আসা হিউস্টন,নিউ অর্লিয়েন্স আর মিসিসিপির ছোট্ট শহর বিলক্সির চেনা রাস্তা।অচেনা মানুষ।পাখির গান। ফুলের গন্ধ। লাইট হাউস। সমুদ্রের পাড়ে হারিয়ে যাওয়া। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি, মেঘ।নাম নাজানা কত ফুল।মাথার উপর ঢেকে থাকা আকাশ আর আমার ছোট্ট বন্ধু মালালাকে  নিয়েই আমার এলোমেলো মনে যা আসে তা- এখানে আপনাদের জন্যপ্রাণের বাংলায় থাকলো

চার.

পরদিন মালালার স্কুল।স্কুলে যেতে খুব পছন্দ তার।এ শহরে বাঙালীর বাস হাতে গোনা।তায় আবার মেয়ে বাচ্চা নেই বললেই চলে। আর মালালার বন্ধু বলতে স্কুল আর স্কুল বাসের জনা কয়েক। তাই স্কুলে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে।আর স্কুলের মিসদের সঙ্গে সখ্য তাদের দারুণ।

পত্রবিহীন গাছ

রাতে মালালার সঙ্গে কথা হলো,সকালে বাস পর্যন্ত আমিই তাকে পৌছে দেবো।সামান্য পথটুকু ওর বাবা-মা গাড়ি করে পৌছে দিলেও আমি হেটে যাওয়ার সিদ্ধান্তই নেই।৭টায় স্কুল।৬টাতেই আমরা বিছানা ছাড়ি।ঘুমঘুম চোখে মালালা দাতঁ ব্রাশ থেকে ব্রেকফাস্টের টেবিল পর্যন্ত গড়ায়।মায়ের তাড়া আমার তাড়ায় তার গতি এগোয়।এবার ঘর থেকে বাইরে নামি।তখনও রাত তার দায়িত্ব দিনকে বুঝিয়ে দেয়নি।চারিদিক অন্ধকার।অ্যাপার্টমেন্ট কম্পাউন্ড সড়কের লাইটগুলোতে দীর্ঘ রাতের পর ক্লান্তির ছাপ।তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি ফারেনহাইট।জ্যাকেট গায়ে ছড়িয়েও আমি শীতে জবুথুবু। মালালা জ্যাকেট-ফ্যাকেট ছাড়া দিব্যি আছে।মনে হলো সময়ের হিসেবে দু’বছর অনেকটা সময়।মালালা তাই নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে বেশ গুছিয়ে নিয়েছে।

পত্রবিহীন গাছপালাগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে।ঠান্ডা বাতাস বুকের কাছে জাপটে ধরে।পথে কোনো লোকজন নেই।আমার একটু ভয় ভয় করছিলো।পর মুহুর্তে মনে হলো আমিতো আর আমার দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই,যেথায় দিনের বেলাতেও মেয়েরা নিরাপদ নয়।আকাশটা শরতের আকাশ হয়ে ঘিরে আছে।দূর থেকে দেখে মনে হয়, যেনো লাল আকাশে কেউ ভাসিয়েছে এক ফালি সাদা মেঘ। আমাদের সঙ্গে করে হাঁটছে চাঁদ।অন্ধকারে পেছন থেকে মালালাকে কে যেনো ডাক দিলো।এবার মালালা পেছন ফিরে দৌড়।আমি কিছুটা ভড়কে গিয়ে থেমে যাই।কাছে আসতেই দেখি একটা ছেলে মালালার সঙ্গে এগিয়ে।পাশে পাশে হাঁটছেন এক ভদ্রলোক।মালালা পরিচয় করিয়ে দেয়-‘আমার বন্ধু আফওয়ান।আমার চেয়ে এক ক্লাশ উপরে পড়ে, আর উনি আঙ্কেল। আফওয়ানের বাবা।’ কুশল বিনিময় করে আমরা সামনে এগোই।উনারা বাপ-বেটা দু’জনেই জ্যাকেট আর টুপি পড়া।

কম্পাউন্ডের গেটে পৌঁছে দেখি অনেকেই এসে দাঁড়িয়ে।অনেক গার্জিয়ানরা গাড়ি করে বাচ্চা নামিয়ে দিয়ে তাদের কর্মস্থলের উদ্দেশে চলে গেছেন।কেউ কেউ আবার বাচ্চার হাত ধরে দাঁড়িয়ে।ঠিক ৬.৪৫ বাসটা এসে গেটে থামে। ড্রাইভিং সিটে একজন মহিলা বসে। বাচ্চারা সবাই লাইন ধরে উঠে বসে।বাস ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

ফেরার পথে আফওয়ানের বাবার সঙ্গে কথা হয়। ভদ্রলোক বাংলাদেশে একটা ডেভোলপার কোম্পানিতে চাকরী করতেন।এই মার্কিন মুল্লুকে এসেছেন তিন মাস হলো।বলেন,‘ আসলে বাচ্চাদের পড়াশোনার আর সিকিউরিটির কথা ভেবেই এই বয়সে এদেশে আসা।’ভদ্রলোক এখানে একটা গ্যাস স্টেশনে চাকরী করেন।এই অ্যাপার্টমেন্ট হোমেই থাকেন।এবার বুঝলাম উনারা কেন শীত পোশাকে! এতো অল্পদিনে উনারা এখনও প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠতে পারেননি।

এতক্ষনে মনে হলো অন্ধকারের গায়ে অল্প অল্প আলো ফুটছে।রাস্তার বাঁকে বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা পত্রবিহীন নি:সঙ্গ গাছেদের ডালে পাখিরা আড়মোড়া ভাঙছে।আমি পাখি আর গাছেদের ঘুম ভাঙাতে ভাঙাতে হাঁটতে থাকি।পন্ডের ফোয়ারাগুলো অবিরাম চলছে। চারিদিক শান্ত বলে পানির শব্দতরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে।বেশ একটা মন ভালোকরা দিনের শুরু হলো।

স্কুল ছুটির পর ২.৩০ মিনিটে আবার বাস থামবে গেটে।বাইরে রোদের চোখ গরম।এখানে সানস্ক্রিম ছাড়া এক পা চলাও কঠিন।মালালার মা গাড়ি নিয়ে বের হতে চাইলো।আমি বললাম না, আমি হেটেই যাবো, আর বেরিয়েই পড়লাম।তাপমাত্রা তখন ৪৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট।তবে রোদের গায়ে বাতাসের বেশ দাপট।প্রকৃতি একেবোরে বিপক্ষে নয়।গেটের কাছে আসতেই একজন বাঙালী মহিলার দিকে চোখ ফেরে।ভদ্রমহিলা রোদ থেকে নিজেকে বাঁচাতে একটা বড়োসড়ো গাছের গুড়িতে বসে আছেন।আমাকে দেখে  এগিয়ে

শান্ত পন্ড

আসেন।জানতে পারি উনি আফওয়ানের মা।মুখটা বড়ো বিষন্ন।উনি উনার বরের কাছ থেকেই আমার পরিচয়টা জেনে গেছেন।এগিয়ে এসে কথা বলেন।তবে মার্কিন মুলুকটা উনাকে একেবারেই আপন করতে পারছে না।এখানকার কিছুই ভালো লাগেনা উনার।বরের প্রেশারেই দেশ ছাড়তে হয়েছে বলে জানান।দেশের জন্য সবসময় মন কেমন করে।জানলাম মন খারাপ করেই তিনটে মাস পার করেছেন।আমি আস্বস্ত করতে চেষ্টা করি বললাম, ‘প্রথম প্রথম সবারই মন কেমন করে,পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ আমার কথাটা উনার তেমন পছন্দ হয়েছে বলে মনে হলো না।

বাস এসে থামে।রাস্তার সব প্রাইভেট গাড়ি আর বাস মুহুর্তেই চলাচল বন্ধ করে থেমে যায়।যতক্ষন স্কুল বাসটা না চলবে ততোক্ষন আর  কিচ্ছু চলবে না। এ নিয়মটা কঠোর ভাবেই পালন করা হয়। বাচ্চাদের সুবিধার জন্য এখানে অনেক নিয়ম-কানুন বেঁধে দেয়া আছে।

 বাস থেকে নেমেই মালালা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। ওর সব বাস বন্ধুরাও এসে আমাকে জড়িয়ে  ধরে।ফর্সা ফর্সা গালগুলোতে যেনো আবীর মাখানো।একে একে সবার নাম জানি, স্কাইলার, স্কাইলি,কারা,আসোনি, কালিয়া আরও অনেকে।এবার সবাই দৌড়ে দৌড়ে বাড়ি ফিরছে।এতো রোদেও কারো চোখেমুখে একফোটা ক্লান্তির ছোঁয়া নেই। মালালা স্কুল ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে ওদের সঙ্গে যোগ দেয়।এভাবেই খেলতে খেলতে সবাই বাড়ি ফিরি।

 

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199