কয়েক স্লিপ শীত

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

এডমিন ডেস্ক, ঢাকা থেকে

প্রকাশ: 18 Dec 2025

1280 বার পড়া হয়েছে

Shoes

কয়েক স্লিপ শীত-ই তো আসলে। কোথাও লেখা-কুয়াশা চাদর জড়িয়ে মাঠের দিকে হাঁটছে, কোথাও লেখা, ঘুঘু পাখির গলায় চুমু খাচ্ছে উত্তরের হাওয়া, কোথাও লেখা-গভীর রাতে ইলেকট্রিকের তারে ফাঁসিতে ঝুলছে প্যাঁচার ভৌতিক স্বর! শীতের আয়নায় নিজের অস্পষ্ট মুখ দেখতে দেখতে আর ভাবতে ভাবতেই কয়েকটা স্লিপ বাতাসের আগ্রাসনে উড়ে যায়। কফির কাপ সামনে রেখে ক্যাপুচিনো আর লাতের ভালোমন্দ নিয়ে তর্ক, জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফেরা, জনমানবশূন্য দোচালা ঘরের অর্ধেক পোকায় খাওয়া ঠুনিতে হেলান দিয়ে বসে থাকা নিঃস্ব দুপুর, ফসলের মাঠ, নদীর কপাল ছোঁয়া পাখির উড়ন্ত ডানা আমাদের জানায়, চরাচর জুড়ে হিম পড়ে গেলো।

তবুও শীত এলো কী? সলজ্জ পায়ে, শিউলী ফুলে ছড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধ ভোরবেলা দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লো কি অন্দরমহলে? খাতাকলমে শীতের সেই হিসাব রাখে আবহাওয়াবাড়ি।আমরা শুধু টের পাই আকাশ এখনও শীতের আগে আশ্চর্য নীল হয়ে যায়!

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে শীত নামার মুখে রইলো ‘কয়েক স্লিপ শীত’।

বে-আক্কেলে শীত কবিতায় ভেসে যায় না এখন আর।  পাড়ার মোড়ে পোষা কুকুরটা বসে অপেক্ষা করে না প্রভুকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবে বলে। আদ্যোপান্ত নস্টালজিক কেউ পুরনো চাদরে ন্যাপথালিনের ঘ্রাণ নিতে নিতে বলে ওঠে না-এবার খুব শীত পড়বে। দেখো, আকাশটা কেমন নীল! তবু শীতকাল এলে দূরে যেতে চায় মানুষ। বনবিভাগের কোনো ডাকবাংলোর ঠাণ্ডা হয়ে থাকা মেঝে, নিঃসঙ্গ রাতে পোকামাকড়ের ডেকে ওঠা কারও শীত-লাগা শরীরের গভীরে ঢুকে যায়। হিমকাল ভেঙে স্মৃতির আঙুল তার মাথার ভিতরে অন্য এক পৃথিবীর দরজা খোলে নিঃশব্দে ছিটকিনি নামিয়ে। সেখানে কাক ডাকা ভোরে অবিরাম ঝরে পড়ে শিশিরের ফোঁটা; মাঠে ঝুলে থাকে জাল দেয়া জাউ ভাতের মতোন কুয়াশার চাদর; জেগে ওঠে সন্ধ্যার সাড়হীন নির্মম শীতের প্রান্তর; রাতে শীত লেগে মৃদু কেঁপে ওঠা গরুর পিঠের চামড়ার মতো হাওয়া বয়ে যায়।

শীতকাল এলে কাছেও থাকতে চায় মানুষ। নীল রঙের উলে বোনা সোয়েটার সুটকেস থেকে বের করে পুরনো ওমের নির্ভরতা খুঁজে নিতে চায়। টি এস এলিয়ট কবিতায় লিখেছেন, ‘‘আমি রাত্রিকে পড়ে ফেলি তীব্র/ শীত এলে ভেসে যাই দক্ষিণে’’। শীতের তীব্র রাতে মানুষ কতকিছুর কাছে গিয়ে বসে!মাকড়সার মতো নিজেকে জড়ায় কোনো আগুনের পাশে, পানশালা থেকে বের হয়ে হাঁটতে থাকে শীত ভেদ করে। কিন্তু তখনও রুটির দোকানের বন্ধ সাটারের পাশে গুটিশুটি আশ্রয় নেয়া বৃদ্ধ মানুষটার কাছে ক্ষুধা অজেয় হয়েই থাকে। হয়তো সে ভাবে অনেক অনেক আগের কোনো সুখী দিনের কথা।

শীতে লেখা কয়েক স্লিপ বাতাসে উড়ে যায়। ধানের জমি ভেঙে ওঠা ইঁটের দালান আর ঝকঝকে আলো মোড়া মফস্বলে কিছু মশাকে নির্জন হয়ে আসা রেস্তোরাঁয় বসিয়ে শহরে ফেরে কেউ। তার মাথার ভিতরে শীতঋতু ছেয়ে থাকে। শিকড় ছড়িয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা লাগার ভয় গলায় মাফলার জড়ায়। শীত এলে পাহাড়ে যায় কেউ, কেউ বা অরণ্যে। শীত এলে পৃথিবীতে যুদ্ধও বাধে নতুন করে। জ্বালানী নিয়ে সংকটের রাজনীতি সংবাদ শিরোনাম হয় দেশে দেশে। জীবনানন্দ দাশ নিঃশেষ হওয়ার বাসনা থেকে লেখেন, ‘‘যদি আমি ঝরে যাই কার্তিকের নীল কুয়াশায়’’। তখন মনে হয় শীতের জাহাজের মাস্তুল মেঘ কেটে কেটে এসে দাঁড়িয়েছে বন্দরে নিয়ে যাবে বলে আমাদের। তখনও আমাদের চোখে গাবের আঠার মতো ঘুম। টিনের ঘরের জানালা পাশে শিউলি গাছ নিয়ে একা জাগে, জেগে থাকে। ঠাণ্ডা পড়ে কট কট শব্দ ওঠে চাল থেকে। জেগে ওঠে ঘুমন্ত পায়রাও। শিমুল তুলার লেপ ভালোবেসে ঘুমকে বলে, আরও বহুদিন ঘুমাও; কী হবে এত জেগে থেকে?

ছবিঃ গুগল

মন্তব্য করুন

Share Article

আরো পড়ুন

আরো পড়ুন

স্বত্ব © ২০১৬ - ২০২৩ প্রাণের বাংলা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: আবিদা নাসরীন কলি।

Email: Article: [email protected], Avertising: [email protected]

Phone: +8801818189677, +8801717256199